০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান হারাল বাংলাদেশ

তিন মাসে দেশটি থেকে আমদানি বেড়েছে দ্বিগুণ

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান হারাল বাংলাদেশ

ছবি: রয়টার্স

আবদুর রহিম হারমাছি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Oct 2026, 12:52 AM

Updated : 08 Oct 2026, 12:52 AM

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ বলে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বাড়লেও রপ্তানি কমছে। এর ফলে বাজারটিতে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান হারিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বরাবরই শীর্ষ স্থানে ছিল ভিয়েতনাম; এখনও সেই স্থান ধরে রেখেছে দেশটি। দ্বিতীয় ছিল বাংলাদেশ; সেই স্থান এখন দখলে নিয়েছে চীন।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে অগাস্ট সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ (৫.৩৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।

এই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬৩ কোটি সাত লাখ (৫.৬৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; যা ২০২৫ সালের জানুয়ারি-অগাস্টের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ (৪.৬৬ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল; যা ছিল গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কম।

একই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫৫ কোটি ৫৭ লাখ (৪.৫৫ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। তবে এটিও ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের চেয়ে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ কম।

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মত আসে দেশটি থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০২২ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি (৯.৭৩ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছিল। কিন্তু পরের বছর প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমে। ওই বছরে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৭২৯ কোটি ডলার।

২০২৪ সালে আবার রপ্তানি সামান্য বেড়ে ৭৩৪ কোটি ডলার হয়; শতাংশ হিসাবে বেড়েছিল দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে বেড়েছিল ১২ শতাংশের মত; রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৮২০ কোটি ডলার।

অটেক্সার তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা চলতি বছরের জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে মোট ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৫ লাখ (৪৯.০৭ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কম।

গত বছরের প্রথম আট মাসে ৫ হাজার ৩০০ কোটি ৮২ লাখ (৫৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক আমদানি করেছিলেন দেশটির ব্যবসায়ীরা।

এই আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ ছিল ভিয়েতনাম। তারপরও দেশটি থেকে আমদানি শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে ১১০৫ কোটি ৯২ লাখ ডলার থেকে ১০৯৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে নামে।

পিস হিসেবে পোশাক রপ্তানি কমেছে ২.৭৫ শতাংশ

পিস বা পোশাকের সংখ্যার হিসাবে জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই আট মাসে ১৭৫ কোটি ৫৬ লাখ পিস পোশাক রপ্তানি হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ১৮০ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার পিস।

তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, পিস হিসাবে জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনেরও পোশাক রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ৬১ শতাংশ। এই আট মাসে বাজারটিতে ৩৮২ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার পিস পোশাক রপ্তানি করেছে চীন।

অন্যদিকে একই সময়ে পিসের হিসাবে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ। এই আট মাসে বাজারটিতে ৩০৯ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার পিস পোশাক রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম।

ভারতের কমেছে ২৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাসের কমেছে যথাক্রমে ২১ দশমিক শূন্য নয়, শূন্য দশমিক ২৭ এবং ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ।

তবে ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। কম্বোডিয়ার বেড়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ।

অন্যদিকে ইউনিট মূল্যের ক্ষেত্রেও প্রায় সব দেশেই পতন দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে চীনের, ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বাংলাদেশে ইউনিট মূল্য কমেছে তুলনামূলকভাবে মাঝারি হারে, ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য কমেছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়ার, ভারত ও পাকিস্তানের কমেছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৪৯, শূন্য দশমিক ২৫, ২ দশমিক শূন্য চার ও ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

বেড়েছে মেক্সিকো ও হন্ডুরাসের। মেক্সিকোর বেড়েছে ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ। হন্ডুরাসের বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

কী বলছেন রপ্তানিকারকরা

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি কেন কমছে এমন প্রশ্নে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “সামগ্রিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা কিন্তু কম পোশাক আমদানি করেছে। তার প্রভাব আমাদের উপরও পড়েছে।

“আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সব দেশের কমেছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি যেটা কমেছে, সেটা কিন্তু চীন ও ভারতের তুলনায় অনেক কম। এর পরও চীন আমাদের পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে গেছে। এর কারণ, চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে আগ্রাসী মার্কেটিং করছে। অর্থাৎ তারা কম দামে পোশাক রপ্তানি করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে।”

তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের কারণে সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সমস্যার মুখে পড়েছে। একেক সময় একের হারে শুল্ক আরোপ করায় সব হিসাবনিকাশ পাল্টে গেছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যদিও আট মাসের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার বৈশ্বিক আমদানি কমার তুলনায় কম। তবে সবশেষ অগাস্ট মাসে কমেছে কিন্তু অনেক; ১৬ শতাংশের মত। এটাই আমাদের জন্য উদ্বেগের। গ্যাস-বিদুৎ সমস্যার সমাধান না হলে আগামীতেও কিন্তু এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে।”

বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে নতুন কৌশল, মূল্য প্রতিযোগিতা ও ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

একই কথা বলেন নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশে বিদ্যুৎ সমস্যা তো ছিলই। গ্যাসের তীব্র সংকট শুরু হয় ২১ জুলাই থেকে। এখন কিছুটা সুরাহা হয়েছে। গ্যাস সমস্যার কারণে বেশ কয়েকদিন স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বন্ধই ছিল বলা যায়। এ সময়ে আমরা মিলগুলো থেকে কোনো কাপড় পাইনি। পোশাক তৈরি করতে পারিনি; রপ্তানিও হয়নি। তার প্রভাব আমাদের প্রধান বাজার আমেরিকাতেও পড়েছে।”

গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে আগামী মাসগুলো আরও খারাপের দিকে যাবে বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

তিন মাসে আমদানি বেড়েছে দ্বিগুণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক সর্বশেষ পণ্য আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৮৯ কোটি ৬২ লাখ বা প্রায় ১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ।

এর মধ্যে বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আমদানি হয়েছিল ৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পণ্য। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৯ কোটি ৬ লাখ ডলারে। এই হিসাবে তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে ১১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও বিটুমিনসহ খনিজ জ্বালানি ও তেল থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য।

এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭৭ কোটি ৫২ লাখ ডলার। অথচ প্রথম প্রান্তিকে এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।