পোশাক খাত প্রবৃদ্ধির ধারায়, অক্টোবরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪.৩৯%
“মাঝে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা ছিল। তার পরও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে,” বলেন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।
পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
নানা সংকটের মধ্যেও চলতি অর্থবছরের চতুর্থ মাস অক্টোবরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯৯ কোটি ১৮ লাখ (৩.৯৯ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছে, যা গত আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। আর এ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরের চেয়ে বেশি ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) রোববার রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় অক্টোবরে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে ৩১৬ কোটি ৭৮ লাখ ডলার আয় করেছেন এ খাতের রপ্তানিকারকরা। যা গত বছরের অক্টোবরে চেয়ে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি।
নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরেও রপ্তানি আয় বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। মাঝে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা ছিল। তার পরও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এখন আমাদের পোশাক রপ্তানির পিক মৌসুম (ভরা মৌসুম) চলছে।
“অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাস আমরা সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করি। সে বিবেচনায় ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে।”
গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে শুরু হয়েছিল চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর।
এ আর্থিক বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি করে ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার আয় করেছিলেন বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা। যা ছিল গত অর্থবছরের জুলাইয়ের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ কম। প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক থেকে আয় কমেছিল প্রায় ২ শতাংশ।
দ্বিতীয় মাস অগাস্টে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৪২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার আয় হয়েছিল। যা ছিল গত বছরের অগাস্টের চেয়ে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি।
তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে আয় হয়েছিল ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সার্বিক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট ১ হাজার ৭০৮ কোটি ৫৯ লাখ (১৭.০৮ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছে।
গত ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে আয় হয়েছিল ১ হাজার ৬১৩ কোটি ৭০ লাখ (১৬.১৪ বিলিয়ন) ডলার।
তবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয়েছিল ওই অর্থবছর। ৩০ জুন শেষ হওয়া সেই আর্থিক বছরে পণ্য রপ্তানি করে মোট ৪ হাজার ৮০০ কোটি ১৯ লাখ (৪৮ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল। যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছিল ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সার্বিক হিসাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কমেছিল প্রায় ১৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি (৫৫ বিলিয়ন) ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার।
চলতি অর্থবছরে ৫ হাজার ৫২০ কোটি (৫৫.২০ বিলিয়ন) ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে বিএনপি সরকার, যা শতাংশের হিসেবে গত অর্থবছরের মোট আয়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে ১২.১০%
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মত আসে এই দেশটি থেকে।
ইপিবির দেশভিত্তিক রপ্তানি আয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাল্টা শুল্কসহ নানা সমস্যার মধ্যেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে।
অক্টোবরে দেশটিতে ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছেন রপ্তানিকারকরা। যা গত বছরের একই চেয়ে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। আর আগের মাস সেপ্টেম্বরের চেয়ে বেশি ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। ওই মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৭২ কোটি ৪০ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৬৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিলেন রপ্তানিকারকরা।
চলতি আর্থিক বছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে দেশটিতে ৭২ কোটি ৪০ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল; প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ।
দ্বিতীয় মাস অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ৯৪ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। যা ছিল গত বছরের একই মাসের চেয়ে ২৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেশি।
অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এই বাজারে রপ্তানি বেড়েছিল শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছিল ৯১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। গত বছরের এ মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৯১ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।
চার মাসের (জুলাই-অক্টোবর) হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ; রপ্তানি হয়েছে ৩৩৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের পণ্য।
এছাড়া অক্টোবরে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। জার্মানি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডে বেড়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৫৯, ১২ দশমিক ৪৬, ১০ দশমিক ৯৬ ও ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। তুরস্কে বেড়েছে ৪৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।
বেশি কমেছে ফ্রান্সে, ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। পোল্যান্ডে কমেছে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ। কানাডায় কমেছে ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। জাপান ও ভারতে কমেছে যখাক্রমে শূন্য দশমিক ৭৩ ও ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ।
৭৯.৩৬% এসেছে পোশাক থেকে
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের চতুর্থ মাস অক্টোবরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে ৩১৬ কোটি ৭৮ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ৩৯৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, অক্টোবরে মোট রপ্তানি আয়ের ৭৯ দশমিক ৩৬ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে।
এই মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার; গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে যা ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। আর ওভেন পোশাক থেকে আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ; এসেছে ১৪০ কোটি ২৫ লাখ ডলার।
সার্বিক হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে এক হাজার ৩৭৪ কোটি ৬৩ লাখ ডলার; বেড়েছে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি।
গত বছরের এই চার মাসে পোশাক থেকে আয়ের অঙ্ক ছিল ১ হাজার ২৯৯ কোটি ৩ লাখ ডলার।
অন্যান্য খাত
অন্যান্য পণ্যের মধ্যে অক্টোবর মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে বেড়েছে ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, ২৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বাইসাইকেল থেকে বেড়েছে ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ।
তবে হোম টেক্সটাইলে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। প্লাস্টিক পণ্যে কমেছে ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ। কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি থেকে কমেছে ২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
আগের খবর:
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে রপ্তানি বাড়ল ৮.৫৪%, আয় বাড়ায় বিস্মিত এক রপ্তানিকারক
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটেও অগাস্টে রপ্তানি বাড়ল ১৩%, খুশি নন রপ্তানিকারকরা
