গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে রপ্তানি বাড়ল ৮.৫৪%, আয় বাড়ায় বিস্মিত এক রপ্তানিকারক
মূলত পোশাক রপ্তানির ওপর ভর করেই সার্বিক রপ্তানি আয় বেড়েছে বলে তথ্য দিয়েছে ইপিবি।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের মধ্যেও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে সেপ্টেম্বরেও। এ মাসে আয় এসেছে ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি।
তবে নানা ধরনের সংকটের মধ্যে অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধিতে অবাক হয়েছেন রপ্তানিকারকদের কেউ কেউ। কীভাবে রপ্তানি আয় বাড়ল তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বৃহস্পতিবার রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ এ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, মূলত পোশাক রপ্তানির ওপর ভর করেই সেপ্টেম্বরে সার্বিক রপ্তানি আয় বেড়েছে। এ মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ডলার আয় করেছেন এ খাতের রপ্তানিকারকরা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।
তবে এমন প্রবৃদ্ধির তথ্যে অবাক হয়েছেন নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অগাস্টের পর সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় বাড়ায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। গ্যাস ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না। উৎপাদন হয়নি। রপ্তানি করতে পারি নাই। তারপরও ইপিবির তথ্য বলছে, রপ্তানি বেড়েছে। জানি না কারা রপ্তানি করছে; কীভাবে করেছে; কেমনে বেড়েছে? ইপিবি বলছে বেড়েছে, মাসআল্লাহ…।
“এটুকুই…এছাড়া আর কোনো বক্তব্য নেই আমার।”
দেশে তীব্র গ্যাস সংকট শুরু হয় ২১ জুলাই থেকে। এতে স্থানীয় বস্ত্র কারখানাগুলো বন্ধই ছিল বলা যায়। তবে এখন সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়েছে। এতে আবার উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছে শিল্প কারখানায়।
এরমধ্যেই আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হলেও অগাস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বরে মোট রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ।
এবারের অর্থবছরের শুরুটাও হয়েছিল রপ্তানি আয় কমার মধ্য দিয়ে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি করে ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ (৪.৭৩ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছেন বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা, যা ছিল গত অর্থবছরের জুলাইয়ের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ কম। প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক থেকে আয় কমেছিল প্রায় ২ শতাংশ।
দ্বিতীয় মাস অগাস্টে রপ্তানি থেকে ৪৪২ কোটি ৯৫ লাখ (৪.৪৩ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল, যা ছিল গত বছরের অগাস্টের চেয়ে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। তবে প্রথম মাস জুলাইয়ের চেয়ে কমেছিল ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৭৭ কোটি ৬ লাখ (৪.৭৭ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল। দ্বিতীয় মাস অগাস্টে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ (৩.৯১ বিলিয়ন) এবং তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে ৩৬২ কোটি ৭৬ লাখ (৩.৬৩ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিলেন বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ সমযে মোট এক হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার আয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আয় হয়েছিল এক হাজার ২৩১ কোটি ৩২ লাখ ডলার।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ১৯ লাখ ডলার, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছিল ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে ১০ শতাংশ
একক দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মত আসে এ দেশ থেকে।
ইপিবির দেশভিত্তিক রপ্তানি আয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাল্টা শুল্কসহ নানা সমস্যার মধ্যেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে।
সেপ্টেম্বরে দেশটিতে ৭২ কোটি ৪১ লাখ ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছেন রপ্তানিকারকরা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। তবে আগের মাস অগাস্টের চেয়ে কমেছে ২৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ বাজারে ৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হযেছিল।
অগাস্টে দেশটিতে ৯৪ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল, যা ছিল আগের বছরের অগাস্টের চেয়ে ২৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেশি।
তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ; রপ্তানি হয়েছে ২৫৯ কোটি ১৬ লাখ ডলারের পণ্য।
এছাড়া সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। স্পেন, নেদারল্যান্ড ও পোল্যান্ডে বেড়েছে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ২৪, ১০ দশমিক ৯৬ ও ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
কানাডায় বেড়েছে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। জাপান ও ভারতে বেড়েছে যখাক্রমে ২ দশমিক ৮৮ ও ১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
তবে জার্মানিতে কমেছে ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ; ফ্রান্সে কমেছে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমেছে।
৭৮.৩০% এসেছে পোশাক থেকে
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ডলার আয় হয়েছে। মোট রপ্তানি আয়ের যা ৭৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।
এ মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭৭ কোটি ডলার, গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে যা ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। আর ওভেন পোশাক থেকে আয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আয় এসেছে ১৩১ কোটি ২৯ লাখ ডলার।
সার্বিক হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে এক হাজার ৫৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলার; বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
গত বছরের এই তিন মাসে পোশাক থেকে আয়ের অঙ্ক ছিল ৯৯৭ কোটি ৪ লাখ ডলার।
অন্যান্য খাত
অন্যান্য পণ্যের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে বেড়েছে ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ। হোম টেক্সটাইল রপ্তানি থেকে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।
ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এছাড়া প্লাস্টিক পণ্য থেকে বেড়েছে ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমেছে।
তবে কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ২১ দশমিক ৭০ শতাংশ। হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি থেকে কমেছে ১৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
বাইসাইকেল থেকে কমেছে ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ।
