Published : 02 Jul 2026, 06:30 PM
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে ভারতের তৈরি ‘ব্রহ্মস’ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি নিয়ে বড় চুক্তি হতে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক নিরাপত্তা বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আমিরাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় এটি হতে পারে এক মাইলফলক।
এর ফলে বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ নিরাপত্তার বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে ভারত।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত মাস জুনের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের চলমান আলোচনার মধ্যে ভারতের স্বয়ংক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ‘আকাশতীর’ বিক্রির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তির বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হয়নি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র আমদানিকারক দেশের তকমা ঘুচিয়ে একটি বড় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিকারক দেশ হয়ে ওঠার লড়াইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ ভারতের জন্য প্রতীকী ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘ব্রহ্মস’ একটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
এটি ভূমি, সমুদ্র কিংবা আকাশ, যে কোনও পথ থেকে নিক্ষেপ করা যায় এবং এটি শব্দের চেয়ে তিন গুণ বেশি গতিতে চলতে সক্ষম।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ বি শিভানে বলেন, “ভারতের জন্য এটি একটি বড় আত্মবিশ্বাস বর্ধক সিদ্ধান্ত। এটি ভারতকে শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারকের কাতার থেকে একজন বিকাশমান রপ্তানিকারক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
একইসঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করবে এবং বিশ্বকে দেখাবে যে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রমাণিত ও কেনার যোগ্য।”
শিভানে আরও জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের আরও কিছু প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ‘আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র, ‘পিনাকা’ রকেট ব্যবস্থা, নিখুঁত নিশানার গোলাবারুদ এবং নৌ বা উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য ড্রোন।
অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন যে, এই চুক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে একই ধরনের অস্ত্র কেনায় উৎসাহিত করতে পারে।
তিনি বলেন, “সংযুক্ত আরব আমিরাত অত্যন্ত আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রেতা এবং বর্তমানে তাদের কাছে সেরা মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। অন্য কথায়, “ব্রহ্মস ক্রয়াদেশ অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ভারতীয় অস্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করবে।”
ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ইতিমধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া, সাইবার নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানসহ গভীর প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব রয়েছে।
উপসাগরীয় বাজারে বহুমুখিতা ও কৌশলগত অবস্থান:
শিভানে বলেন, দুই দেশের মধ্যে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে। এই ধরনের একটি বড় চুক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অস্ত্র সরবরাহে বহুমুখিতা এনে দেবে এবং তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তেহরানের সংঘাতের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছিল।
সে সময় দুবাই এবং আবুধাবির মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, যার ফলে আকাশসীমা বন্ধ করতে হয়েছিল। তবে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছিল।
এই চুক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিরক্ষা বাজারকে বহুমুখী করার পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব ‘অ্যাক্ট ইস্ট, লিঙ্ক ওয়েস্ট’ কৌশলকে এগিয়ে নেবে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার সঞ্জয় আইয়ার বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এই আলোচনা আগের চুক্তিগুলোর তুলনায় অনেক বড় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্জয় আইয়ার বলেন, “ইরানের হামলার পর আবুধাবি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে এবং তারা এখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সমস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও বর্তমান অনিশ্চিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের পক্ষে কাজ করতে পারে।
কারণ আবুধাবির কেউ তাদের পরবর্তী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সম্পূর্ভাবে ওয়াশিংটন বা প্যারিসের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না এবং ভারতীয় সরঞ্জাম তুলনামূলক কম রাজনৈতিক শর্তে ও সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।
বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে ভারতের অবস্থান:
সঞ্জয় আইয়ার মনে করেন, এই চুক্তি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তির বিরুদ্ধে ভারতের জন্য একটি ‘নীরব ভারসাম্য’ হিসেবে কাজ করতে পারে, যা নিয়ে দিল্লি কিছুটা অস্বস্তিতে ছিল।
গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে বলা হয়েছে যে কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয়ের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
আইয়ার ভারতের এই আলোচনাকে একটি বড় বৈশ্বিক চাহিদার অংশ হিসেবে দেখছেন, যা মূলত তিনটি অঞ্চলে বিস্তৃত: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত দেশ যেমন আর্মেনিয়া, আফ্রিকার কিছু রাষ্ট্র এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো।
উদাহরণস্বরূপ, দুই হাজার চব্বিশ সালে ভারত ফিলিপিন্সের কাছে সাঁইত্রিশ কোটি পঞ্চাশ লাখ ডলার মূল্যের ব্রাহমোস ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং ভিয়েতনামের সাথে আনুমানিক বাষট্টি কোটি নব্বই লাখ ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম অল ইন্ডিয়া রেডিওর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত সমাপ্ত অর্থ বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় বাষট্টি দশমিক বাষট্টি শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে চার দশমিক এক এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড।
অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, ভারতের জন্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে মূল্য এবং গুণগত মানের একটি আকর্ষণীয় মিশ্রণ বজায় রাখা জরুরি।
মার্কিন ও ইউরোপীয় নির্মাতাদের আধিপত্য থাকা দামি যুদ্ধবিমান বা বড় নৌ-জাহাজের চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যের মধ্যম বাজেটের বাজারে ভারতের জন্য প্রতিযোগিতা করা সহজ।
এর পাশাপাশি অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, মূলত ভারত এই বিশেষ বাজারটিকেই লক্ষ্যবস্তু করছে। দুই হাজার চৌদ্দ সালে শুরু হওয়া ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিকে গতিশীল করতে এই অস্ত্র রপ্তানি বড় ভূমিকা রাখবে, যার মূল লক্ষ্য ছিল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গবেষণা ও রপ্তানি বাড়ানো।
এই অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে ভারত ধীরে ধীরে নিরাপত্তা উপভোক্তা থেকে নিরাপত্তা সরবরাহকারী দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে।