Published : 05 May 2026, 09:07 PM
বছরের পর বছর নিজ রাজ্যে দাপটের সঙ্গে শাসন করে এসেছেন ভারতের দুই মুখ্যমন্ত্রী। তারা ছিলেন, অদম্য, অপরাজেয় এবং আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু গত সোমবার তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল সেই দর্প।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কেবল পরাজিতই হননি বরং নিজেদের দুর্গে তারা রীতিমত ধরাশায়ী হয়েছেন। রাজনৈতিক মানচিত্রে তাদের আধিপত্য এখন ধূসর, আর তাদের দলগুলো নিজ রাজ্যেই এখন কার্যত চলে গেল দ্বিতীয় সারির ভূমিকায়।
তাহলে এখন বিরোধী শিবিরের এই দুই তুখোড় নেতার ভবিষ্যৎ কী? আঞ্চলিক শক্তির যে দেয়াল তুলে তারা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অগ্রযাত্রা আটকে দিয়েছিলেন, সেখানে কি তবে সূর্যাস্ত ঘনিয়ে এল? না। তারা দুজনেই লড়াই ছাড়ার পাত্র নন; স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা এখনই হার মানবেন না।
বিজেপি জয়কে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছেন মমতা। অন্যদিকে, স্ট্যালিন বিনয়ের সঙ্গে কিছুটা জেদ মিশিয়ে বলেছেন, “এটি ডিএমকের (দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগম) শেষ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।”
তবে ৭১ বছর বয়সী মমতা এবং ৭৩ বছরের স্তালিনের জন্য এই ধাক্কা কেবল পরাজয় নয়, বরং ফুরিয়ে আসা সময়ের এক কঠিন বার্তা। যেন, ‘ডুবে যাওয়া সূর্যকে ধরার জন্য এক অন্তহীন দৌড়’।
মমতার লড়াকু মনোভাব কী এখনও অটুট?
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ১৫ বছর ধরে বিজেপি’র পেশিশক্তি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজেপির তুমুল প্রচারণার সামনে তাদের হার মানতে হয়েছে।
৫টি বড় বড় নির্বাচনে (২০১৪, ’১৯, ’২৪-এর লোকসভা এবং ২০১৬ ও ’২১-এর বিধানসভা) লড়াই করে প্রতিবারই জিতেছিলেন মমতা।
তবে প্রতিটি লড়াই ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছিল। ২০১৬ সালে যে বিজেপি’র আসন ছিল মাত্র ৩টি, ২০১৯ সালে তা হয় ৭৭ এবং এবার তারা পেল ২০৬টি আসন।
ভোটের ফল আসার পরপরই নিজের সেই চিরচেনা তেজ দেখিয়ে মমতা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, বিজেপি ১০০-র বেশি আসন ‘লুট’ করেছে এবং নির্বাচন কমিশন বিজেপি-র কমিশনে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি অভিযোগ করেছি... কিন্তু তারা কোনওকিছু করছে না।”
‘দিদি’ এখন কী করবেন? তার পরবর্তী পদক্ষেপের প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া গেছে তার বক্তব্যে। তিনি এই পরাজয়কে ন্যায্যতার যুদ্ধ হিসাবে চিত্রায়িত করেছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বদলিকে তিনি ‘গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভবিষ্যতে মমতা সম্ভবত আরো জোরালোভাবে তার সেই পরীক্ষিত ‘বাংলা বনাম বহিরাগত’ বয়ানে সোচ্চার হবেন এবং বিজেপি’র জয়ের মুখে নিজেকে আবারও রাজ্যের ‘রক্ষক’ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন।
তবে পর্দার আড়ালে এখন অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। প্রার্থীর বাছাই থেকে শুরু করে প্রচারণা ব্যবস্থাপনা, এমনকি শাসনের ব্যর্থতা নিয়েও চলবে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
তার বড় পরীক্ষা হবে এখন নিজের দলের ভাঙন রোধ করা। গণ-পদত্যাগ ও দলবদল রোধ করে নিজের অনুসারীদের ঐক্য ধরে রাখা।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে রাজপথে। প্রশ্ন হল, রাজ্য প্রশাসন আর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের ঢাল ছাড়া বিজেপি’র মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মোকাবেলায় মমতা এখন কতটা কার্যকর থাকতে পারবেন?
তিনি নিঃসন্দেহে রাজপথের লড়াকু নেত্রী, সম্ভবত এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী একজন রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর কি তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তাকেই দিতে হবে।
‘ম্যান অব স্টিল’ কি ফিরবেন?
এম কে স্ট্যালিনের দল দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম (ডিএমকে) বরাবরই বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এমনকি ভাষাগত দিক থেকেও বৈষম্যের অভিযোগে স্ট্যালিন নিয়মিতই বিজেপিকে আক্রমণ করে এসেছেন।
গত সাত বছর ধরে এবং তিনটি বড় নির্বাচনে স্ট্যালিনের দল শক্ত অবস্থানে ছিল। ২০১৯ ও ২০২৪ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ডিএমকে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিল।
কিন্তু গত সোমবার তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচনের ফল সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে। দক্ষিণী মেগাস্টার বিজয় থালাপতির দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) তাদের প্রথম আবির্ভাবেই ১০৮টি আসন নিয়ে বাজিমাত করেছে।
মমতার মতো স্ট্যালিনের ক্ষেত্রে কোনও দৃশ্যমান সংকেত ছিল না, নিম্নমুখী কোনও প্রবণতা ছিল না। স্ট্যালিনের পতন হয়েছে সরাসরি।
বিজয় থালাপতির তারকাখ্যাতি, তামিল রাজনীতিতে সিনেমার প্রভাব এবং তরুণ নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি; যা ডিএমকে এর পক্ষে মোকাবিলা করা কঠিন হয়েছে। ম্লান হয়ে গেছে ডিএমকে-র দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
তবে মমতার মতো স্ট্যালিনও লড়াই ছাড়ছেন না। তিনিও এখন মমতার মতোই নিজেকে ‘দ্রাবিড় পরিচয়ের রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন। বিজয়ের জয় তামিলনাড়ুর প্রথাগত ডিএমকে-এআইএডিএমকে- এর দ্বিমেরু রাজনীতির ধারা ভেঙে দিলেও তার মানে এই নয় যে, রাজ্যের দ্রাবিড়ীয় মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।
বিজয় নিজেও পেরিয়ার এবং আন্নাদুরাইয়ের আদর্শেরই কথা বলছেন। বিজয় জানিয়েছেন, তিনি আন্নাদুরাইয়ের আদর্শ অনুসরণ করে জনগণের সেবা করতে চান। পেরিয়ার ই.ভি. রামাসামির নীতি অনুসরণ করে, বিজয় তার মতাদর্শের ধারক হিসেবে দ্রাবিড় ঐতিহ্য, তামিল সংস্কৃতি এবং নারী ও যুবশক্তির ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে এখানে আরেকটি বিষয় আছে। মমতার ক্ষেত্রে তার প্রতিপক্ষকে জানা ছিল। কিন্তু স্ট্যালিনের তা নয়। তার সামনে এখন এক নতুন ধাঁধা। তাকে এমন এক দলের সঙ্গে লড়তে হবে যারা কখনও ক্ষমতায় ছিল না এবং এমন এক মুখ্যমন্ত্রীকে মোকাবেলা করতে হবে, যিনি আগে কখনও রাজনীতিবিদ কিংবা আইনপ্রণেতা ছিলেন না।
মমতা এবং স্ট্যালিন- দুজনেই নিজ নিজ এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে পরাজিত হয়েছেন। নিজেদের উঠোনেই মার খেয়েছেন। মমতা ভবানীপুরে হেরেছেন তার এক সময়ের ঘনিষ্ঠ শুভেন্দু অধিকারীর কাছে।
ওদিকে, স্ট্যালিন কোলাথুর কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন ভিএস বাবুর কাছে, যিনি ২০১১ সালে স্ট্যালিনের জয়ের কারিগর ছিলেন, কিন্তু পরে ব্রাত্য হয়ে পড়েন। এই পরাজয় দুজনকেই রাজনৈতিকভাবে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
গেরুয়া জোয়ার?
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য পুবের রাজ্যে বিস্তার এখন চূড়ান্ত। মমতার পতনের ফলে এখন ঝাড়খণ্ড বাদে পূর্ব ভারতের প্রায় সব রাজ্যই বিজেপির নিয়ন্ত্রণে। তবে দক্ষিণ ভারত এখনও বিজেপির জন্য এক চ্যালেঞ্জ।
কেরালা ও তামিলনাড়ুতে বিজেপি সরাসরি বড় কোনও সুবিধা করতে না পারলেও কেরালায় তিনটি আসন জয় এবং তামিলনাড়ুতে মিত্র এআইএডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগম)-এর শক্ত অবস্থান তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করেছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-এর নির্বাচনী চক্রের প্রথমার্ধ বিজেপির জন্য এক নিরঙ্কুশ সাফল্য নিয়ে এসেছে।