Published : 17 Apr 2026, 01:20 AM
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যে শান্তি আলোচনার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যকার সংঘাত যখন বিপজ্জনক মোড় নিতে যাচ্ছে, তখন আবার দুই পক্ষকে বৈঠকে বসানোর আলোচনা চলছে।
এ অবস্থায় দুই দেশের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে বিভিন্ন দেশে জব্দ করে রাখা ইরানের সম্পদ।
ইরানের কত সম্পদ জব্দ অবস্থায় আছে, এর মধ্যে কী আছে? কোথায় আছে তাদের সম্পদ, কেন ইরান সেগুলো হাতে পাচ্ছে না বা কেনই বা তাদের এ সম্পদ এ মুহূর্তে দরকার, এসব নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয়েছে।
বুধবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা লিখেছে, ইরানের জব্দকৃত সম্পদের সঠিক পরিমাণ ‘অস্পষ্ট’। তবে দেশটির সরকারি প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞরা বিদেশে থাকা মোট সম্পদের পরিমাণ শত বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বলে দাবি করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন দেশের বছরের পর বছর ধরে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে আছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটকে কেন্দ্র করে প্রথম এসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে আরও কঠোর করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশের ব্যাংকে আটকে থাকা তেল বিক্রির আয়সহ নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করতে পারছে না তেহরান।
গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তার প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা আছে, এমন দেশগুলোতে হামলা চালায় ইরান। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নেয় দেশটি। ফলে বিশ্বের বাজারে জ্বালানির দামে উল্লম্ফন ঘটে। এ অবস্থায় ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত হলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আসে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার প্রথম দফা শুরু হওয়ার আগে ১০ এপ্রিল ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, কোনো আলোচনা শুরু হওয়ার আগে বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ অবশ্যই ছাড় করতে হবে।
তার পরদিন ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা চলাকালে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, ইরানি সম্পদের অন্তত কিছু অংশ ‘ছাড়’ দিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও মার্কিন সরকার দ্রুত সে খবর অস্বীকার করে জোর দিয়ে জানায়, ইরানের সব সম্পদ এখনো জব্দ অবস্থাতেই আছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আগামী ২২ এপ্রিল ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্য চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দুই পক্ষের মধ্যে আবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানেও অবশ্যই জব্দ সম্পদ ‘ছাড়’ দেওয়ার বিষয়টি আবার আসবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের জব্দ সম্পদের পরিমাণ কত?
দোহাভিত্তিক অলাভজনক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক শ্নাইডার বলেন, ইরানের এই সম্পদ তাদের হাইড্রোকার্বন (তেল-গ্যাস) বিক্রি থেকে বার্ষিক যা আয় করে, তার প্রায় তিন গুণ।
“এটি বিশাল অংক, বিশেষ করে এমন একটি সমাজের জন্য, যারা কয়েক দশক ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞায় ধুঁকছে,” বলেন তিনি।
শ্নাইডার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই সম্পদ ছাড় দেয়, তাহলে সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হবে এর ওপর কোনো ‘শর্ত’ আরোপ করবে কি না তা এখনো ‘অস্পষ্ট’।
“তবে ইরানের এই সম্পদগুলো নিঃসন্দেহে অনেক প্রয়োজন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার অত্যন্ত ‘বিশৃঙ্খল ইতিহাস’ এবং এর বিস্তারিত আলোচনার জন্য মার্কিন পক্ষে বিশেষজ্ঞের অভাবের কারণে ইরান সেগুলো ফেরত পাওয়া নিয়ে সন্দিহান।”
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওবামা প্রশাসনের অর্থমন্ত্রী জ্যাকব লিউ বলেছিলেন, সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও ইরান বিদেশে থাকা তার সব সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে না।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল ইরান, যার আওতায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়।
লিউ মার্কিন কংগ্রেসে বলেন, বাস্তবে ইরান তার জব্দ সম্পদের সর্বোচ্চ প্রায় অর্ধেকের মতো ব্যবহার করতে পারবে, কারণ বাকি অর্থের বড় অংশ আগেই বিভিন্ন প্রকল্পে প্রতিশ্রুত বা ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল।
বর্তমানে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ‘অবিশ্বাস’ দূর করার ব্যবস্থা হিসেবে অন্তত ৬০০ কোটি ডলারের সম্পদ ছাড় দাবি করছে ইরান।

কোথায় কী সম্পদ?
যখন কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল, সম্পত্তি অন্য কোনো দেশের কর্তৃপক্ষ কিংবা বৈশ্বিক সংস্থা সাময়িকভাবে আটকে রাখে, তাকে সম্পদ জব্দ করা বলা হয়।
নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক কারণে এর মালিকরা ওই সম্পদ বিক্রি বা ব্যবহার করতে পারেন না। সাধারণত কোনো দেশের বিরুদ্ধে ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’, ‘মানি লন্ডারিং’ বা ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের’ অভিযোগে সম্পদ জব্দ করে।
তবে সমালোচকরা একে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঘায়েলের হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। উদাহরণ হিসেবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা বর্ণবাদের অভিযোগ থাকলেও কোনো দেশ তাদের সম্পদ জব্দ করেনি। অথচ ইরান, রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়ার মত দেশগুলোর ওপর ঠিকই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
কেন ইরানের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো ইরানের সম্পদ জব্দ করা হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের তখন বলেছিলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির জন্য ‘অস্বাভাবিক ও গুরুতর হুমকি’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে সময় ইরানি কিছু শিক্ষার্থী তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে রেখেছিল।
তৎকালীন মার্কিন অর্থমন্ত্রী জি উইলিয়াম মিলার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সে সময়ে ইরানের তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬০০ ডলারেরও কম, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল ১৩০ কোটি ডলারের ‘ট্রেজারি নোট’, যা নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা ছিল।
১৯৮১ সালে আলজেরিয়ার মধ্যস্থায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষতি ‘আলজিয়ার্স চুক্তির’ অনুসারে ওই সময় জিম্মি থাকা ৫২ মার্কিন নাগরিককে মুক্তির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সে সম্পদের একটি বড় অংশ ছাড় করেছিল।
পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উভয় দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময়ে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন-জেসিপিওএ’ চুক্তির ফলে ইরান আবার তার সম্পদের নাগাল পায়।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে একতরফা ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান এবং আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানের সম্পদ জব্দ করেন।
২০২৩ সালে বন্দি বিনিময়ের একটি চুক্তির অধীনে ইরান বংশোদ্ভূত পাঁচজন মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন ইরানি নাগরিককে ছেড়ে দেয় এবং ইরানকে জব্দ থাকা কয়েকশত কোটি ডলারের তহবিলে প্রবেশাধিকার দেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালে ইসরায়েলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নতুন নিষেধাজ্ঞা দিলে ইরান দোহাতে থাকা সে তহবিলের নিয়ন্ত্রণ হারায়।

কোন দেশে ইরানের কত সম্পদ আটকা?
একাধিক দেশে ইরানের জব্দ সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। তবে কোন দেশে কত সম্পদ ছড়িয়ে আছে তার সঠিক পরিমাণ ‘অস্পস্ট’।
ইরানের সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চীনে তাদের অন্তত ২০০০ কোটি ডলার, ভারতে ৭০০ কোটি ডলার, ইরাকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার, কাতারে ৬০০ কোটি ডলার (দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পাঠানো অর্থ), যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি প্রায় ২০০ কোটি ডলার, ইরানের তেলের অন্যতম ক্রেতা জাপানে ১৫০ কোটি ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (যেমন লুক্সেমবার্গ) ১৬০ কোটি ডলার আটকে আছে।
সম্পদ হাত পাওয়া ইরানের জন্য কেন জরুরি
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে রয়েছে। তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ব্যাহত হয়েছে এবং শিল্প ও প্রযুক্তি খাত আধুনিকায়ন থমকে গেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রা রিয়ালের দরপতনের জেরে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহায়তায় ‘সন্ত্রাসীরা’ এসব সহিংসতার পেছনে ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দিয়েছিল।
এ অবস্থায় বিদেশে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের সম্পদ ইরানের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য নগদ অর্থ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের এই সম্পদ দেশটির মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রকস্যান ফারম্যানফারমেইয়ান বলেন, “এই সম্পদ ফিরে পেলে ইরান তার তেলের আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা নিজস্ব অর্থনীতিতে ফিরিয়ে নিতে পারবে, যা মুদ্রার মান স্থিতিশীল করতে সাহায্য করবে।
এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মত বিক্ষোভের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এছাড়া দেশটির জরাজীর্ণ তেলক্ষেত্র, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এই অর্থ জরুরি।”
তিনি বলেন, “ইরানের তেলক্ষেত্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো অবকাঠামোগত অবনতির সম্মুখীন হচ্ছে। যদি দেশটি তার সম্পদে অবাধ প্রবেশাধিকার পায়, তাহলে এগুলোর আধুনিকায়ন থেকে সবাই উপকৃত হবে। একইভাবে এ সম্পদ দিয়ে ইরান বিদেশি কোম্পানি এবং তার নিজস্ব শিল্পগুলোর উন্নয়ন শুরু করতে পারবে।”
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাজনীতির শিক্ষক ক্রিস ফেদারস্টোন বলেন, “ইরানের সম্পদ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কূটনৈতিক বার্তা’ হিসেবেও কাজ করবে।”
তার মতে, এ পদক্ষেপ ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমানোর ইঙ্গিত দিতে পারে। এতে করে অন্য দেশ ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়তে পারে।
তবে ফেদারস্টোন সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতির কারণে এই পদক্ষেপ উল্টোভাবে সেই বার্তাও দিতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কতটা ‘অপ্রত্যাশিত’।