Published : 07 Mar 2022, 12:35 AM
অথচ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার ক্ষমতারোহনের শুরুতেই নেটোতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহে তা হয়নি।
এখন ইউক্রেইন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে যে সঙ্কট তৈরি করেছে, রাশিয়াকে এখন নেটোতে নিলে সঙ্কটের সমাধান হবে কি, সেই প্রশ্নও উঠেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায়।
নেটোকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে চলে আসবে ওয়ারশ জোটের কথা। এই দুই সামরিক জোটকে স্নায়ুযদ্ধকালীন দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতার দাপটের অস্ত্র হিসেবেই দেখেন বিশ্লেষকরা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সামরিক জোট নেটো। শুরুতে এর সদস্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবুর্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও পর্তুগাল।

১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের উপস্থিতিতে নেটো চুক্তিতে সই করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন আচেসন। ছবি: ব্রিটানিকা
আর এর প্রতিক্রিয়ায় তখনকার পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৫ সালে গড়ে তোলে ওয়ারশ জোট। শুরুতে এর সদস্য ছিল বুলগেরিয়া, চেকস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মানি, পোল্যান্ড, রুমানিয়া ও আলবেনিয়া।
১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ওয়ারশ জোট বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে নেটো টিকে থাকে এবং ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়ে এখন ৩০ দেশের জোটে পরিণত।
এক সময় ওয়ারশতে ছিল, এমন দেশগুলোও এখন নেটোভুক্ত। রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে তাদের এক সময়ের অংশ কিংবা মিত্র বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, পোল্যান্ড, লিথুনিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, হাঙ্গেরি, আলবেনিয়া, চেক রিপাবলিক এখন নেটো জোটের অংশ। ওই সীমান্তে এখন শুধু বেলারুশই রয়েছে রাশিয়ার পক্ষে।
নেটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরাও অবস্থান নিয়ে আছে, যাকে হুমকি হিসেবে দেখছে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে পরিবর্তিত রাশিয়াও।
এখন ইউক্রেইন নেটো জোটে গেলে কৃষ্ণ সাগরে রুশ কর্তৃত্ব স্পষ্টতই হুমকির মুখে পড়বে, আর সেটা নিয়েই বারবার আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন পুতিন।

১৯৫৫ সালের ১১ মে পোল্যান্ডে স্বাক্ষরিক হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা ওয়ারশ চুক্তি নামে পরিচিত। ছবি: হিস্টরি টু ডে
এর ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেইনে সরাসরি সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় যুদ্ধের সূচনা করেন।
এখন ইউক্রেইনের নেটোতে ঢুকতে বাধা হয়ে দাঁড়ানো পুতিনই যে দুই দশক আগে এই জোটে ঢুকতে চেয়েছিলেন, যুদ্ধের পর আবার উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে।
যুক্তরাজ্যের দৈনিক গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০০০ সালে রাশিয়ায় ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই নেটোতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
নেটোর তৎকালীন মহাসচিব, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ রবার্টসন গার্ডিয়ানকে বলেন, তার সঙ্গে প্রথম বৈঠকে পুতিন সরাসরি পশ্চিম ইউরোপের অংশ হতে নিজের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
পুতিন তখন বলেছিলেন, তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থেই এটা চান।
রবার্টসনের ভাষ্যে, “পুতিন বলেছিলেন, ‘আপনারা কবে আমাদের নেটোকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাবেন?’ আমি বলেছিলাম, আমরা তো কাউকে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাই না, বরং তারাই যোগ দিতে আবেদন করে।”
তখন বিবিসির ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও একই আগ্রহের কথা বলেছিলেন পুতিন। তিনি বলেছিলেন, নেটোতে যোগ দিতে তার কোনো অনিচ্ছা নেই, যদি জোটে রাশিয়ার সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত হয়।
পুতিন তখন এটাও বলেছিলেন, নেটোকে শত্রুজ্ঞান করা তার ভাবনাতেই আসে না।
কেজিবির একসময়ের কর্মকর্তা পুতিন দৃশ্যপটে আসার আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বোরিস ইয়েলৎসিনও নেটোতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট।
ইয়েলৎসিন ১৯৯১ সালে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। কয়েক বছর পর রাশিয়া যখন শান্তির অংশীদারিত্ব চুক্তিতে সই করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, এটা রাশিয়াকে নেটোতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে নেবে।
ক্লিনটন যাওয়ার পর জর্জ বুশ এলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায়। পুতিনের আগ্রহে ২০০২ সালে রাশিয়া-নেটো সংলাপের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা আর গতি পায়নি। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেইনের ক্রিমিয়া দখল করে নিলে তা বন্ধই হয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পাঁচবার বদলেছে, রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন রয়েই গেছেন
এরপর ইউরোপে নেটোর সম্প্রসারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুতিন এখন বলছেন, “এই প্রশ্ন আমরা করতেই পারি, কাকে লক্ষ্য করে এই সম্প্রসারণ।”
তার প্রতিক্রিয়ায় পুতিনও ইউক্রেইনে যে আগ্রাসন চালিয়েছেন, তা থামাতে রাশিয়াকে নেটোতে নিয়ে আসা কি সমাধান হতে পারে?
এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক ড্যানিয়েল ফ্রেড বলেন, এটা ঠিক যে এক সময় রাশিয়াকে নেটোতে আনার একটি পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু এখন সময়টা অন্যরকম।
“এখন রাশিয়কে নেটো সদস্যপদ দেওয়ার মানে দাঁড়াবে আগ্রাসনকে পুরস্কার দেওয়া। এটা বিশ্বকে সম্পূর্ণ ভুল একটি বার্তা দেবে।”

ছবি: রয়টার্স
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুতিনের উদ্বেগ একেবাবে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয় বলে মত রয়েছে কোনো কোনো বিশ্লেষকের।
তারা বলছেন, কল্পনায় হোক আর বাস্তবেই হোক, পতিন পশ্চিমাদের কাছে থেকে হুমকি অনুভব করছেন। এটা সহজে যাবে না। তাই ইউরোপকে নতুন একটি নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে। আর যদি পুতিনকে শান্ত করে যুদ্ধ থামানো যায়, তাহলে সেপথে হাঁটতে ক্ষতি কী?
আবার সোভিয়েত পতনের পর নেটোর মতো সামরিক জোট টিকেয়ে রাখা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অনেকের মতে, তাদেরই একজন মেডিয়া বেঞ্জামিন।
শান্তিবাদী সংগঠন ‘কোড পিংক’র সহপ্রতিষ্ঠাতা বেঞ্জামিন ইনডিপেন্ডেন্টকে বলেন, “স্নায়ুযুদ্ধ শেষের পর নেটোকেও বিলুপ্ত করে দেওয়া উচিৎ ছিল। একটি সামরিক জোট কোনো সমাধান আনতে পারে বলে আমরা মনে করি না।”