Published : 22 Feb 2022, 08:20 PM
বিবিসি’র দুই সাংবাদিক নিজেদের মত করে পুতিনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করেছেন। বিবিসি’র পূর্ব ইউরোপ বিষয়ক বিশ্লেষক সারা রেইন্সফোর্ডের মতে পুতিনের বক্তব্যে মনে হয়েছে, তিনি ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াইয়ে নামতে যাচ্ছেন।
রেইন্সফোর্ড বলেন, সোমবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাকে অসহনশীল দেখাচ্ছিল এবং তিনি সরাসরি হুমকি দিচ্ছিলেন। এটা যেন অনেকটা এমন ছিল, গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি নিজের বুকে আঘাত জমিয়ে রেখেছিলেন এবং এখন পাল্টা জবাব দিচ্ছেন।
পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘‘আপনারা আমাদেরকে বন্ধু বানাতে চাননি। কিন্তু আমাদের জন্য শত্রু বানানোরও দরকার ছিলনা আপনাদের।”
নিজের বক্তব্যে পুতিন স্পষ্ট করে বলেছেন, সবার আগে তিনি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান এবং এ বিষয়ে তিনি একচুল ছাড়ও দেবেন না। এক্ষেত্রে তার মূল দাবি: ওই এলাকায় নেটোর বিস্তার অবশ্যই থামাতে হবে এবং ইউক্রেইনকে কোনওভাবেই নেটোর সদস্যভুক্ত করা যাবে না; ইউক্রেইনের সদস্যপদকে তিনি ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
পুতিনের অভিযোগ, রাশিয়া যেসব বিষয়ে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সেগুলোকে বছরের পর বছর অপ্রাসঙ্গিক ধরে নিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে পুনরুত্থিত বিশ্ব শক্তি মনে করে তাদের ‘দমন’ করার চেষ্টা করে গেছে।
রেইন্সফোর্ড মনে করেন, ইউক্রেইন বিষয়ে পুতিন যতখানি মনযোগ দিয়েছেন তাতে মনে হয়েছে, এটির বিষয়ে তার আবেগ এতটাই বেশি যে অন্যান্য বিষয় নিয়ে খুব কমই তিনি ভাবছেন। এ মুহূর্তে তার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি সেখানে (ইউক্রেইন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াই করতে যাচ্ছেন। বিষয়টা বেশ বিস্তারিত এবং অবশ্যই নিজের বক্তব্যে তিনি ইউক্রেইনের ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন।
পুতিন বলেছেন, ইউক্রেইন এমন একটি দেশ যার স্বাধীন রাষ্ট্রের কোনও ঐতিহ্যই ছিল না, এটি ছিল ভ্লাদিমির লেনিনের সৃষ্ট কৃত্রিম সোভিয়েত রাষ্ট্র। পুতিন এর আগেও ইউক্রেইন বিষয়ে তার এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছিলেন, কিয়েভ যাকে ‘মিথ্যা’ এবং ‘মনগড়া ইতিহাস’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেইনের দুটি অঞ্চলকে পুতিনের স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হল- রাশিয়া আর এই দুই অঞ্চলকে ইউক্রেইনের অংশ মনে করে না।
এই স্বীকৃতির ফলে মস্কোর পক্ষে ডনবাসে (দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক একত্রে ডনবাস নামে পরিচিত) সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনও বাধা থাকল না; স্বীকৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুতিন ঠিক সেই পদক্ষেপই নিয়েছেন।
এক্ষেত্রে ক্রেমলিনের যুক্তি হচ্ছে, তারা কিয়েভের হাত থেকে মিত্রদের রক্ষায় যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করছে এবং এখানে অবশ্যই একটি ‘প্লাস’ আছে- যা হল, বিরোধীদের পাল্টা জবাব কী হয় সেটা দেখার অপেক্ষা করা। পুতিন সেটিই করছেন।
শেষ পর্যন্ত যাই ঘটুক, মোদ্দা কথা হচ্ছে, ইউক্রেইন এখন যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে রাশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্ব মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, দ্রুতই সেখানে উভয় পক্ষ ক্ষমতার প্রদর্শন শুরু করতে যাচ্ছে। ওদিকে, বিবিসি-র কূটনীতি বিষয়ক প্রতিনিধি পল অ্যাডামসের মতে, ইউক্রেইন নিয়ে পুতিনের বক্তব্য জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখার মত।
তিনি বলেন, ‘‘ওই বক্তব্য অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু, চরম দুর্নীতিতে ডুবে থাকা, পরমাণু ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়া এবং স্বাধীনতার পর থেকে রাশিয়ার কাছ থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার পরও অকৃজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি দেশকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখার মত।
‘‘এবং এটি নতুন কিছু নয়। গত গ্রীষ্মেও তিনি (পুতিন) এ বিষয়ে বিস্তারিত একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন এবং সেখানেও অনেক কিছু নিয়ে একই কথা বলেছেন। কিন্তু তারপরও এটি কম হতবাক করা বিষয় নয়।”
‘নেটো কী রাশিয়ার শত্রু তৈরি করছে’?, জিজ্ঞাসা করেছেন পুতিন। পল অ্যাডামস মনে করেন, পশ্চিমা জোট নিশ্চিতভাবেই কখনও এমন করতে চাইবে না। তবে ইতিহাস যেভাবে ঘটেছে তাতে ক্রেমলিন বিরক্ত প্রকাশ করেছে।
নেটোর জিতে যাওয়া মানে রাশিয়ার হার। দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেইন সংকট নিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যখন পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করেন তখন তিনিও বিষয়েটি কে ‘অতীতের ভুলগুলো’ বলে বর্ণনা করেন।
সম্ভবত ম্যাক্রোঁ এই ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন যে, রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমাদের সম্পর্ক এত খারাপ হওয়ার দায় কিছুটা পশ্চিমা বিশ্বকেও বহন করতে হবে।
এখন ইউক্রেইন নিয়ে যে সংকট উপস্থিত হয়েছে, যদি কখনও তার সমাধান হয় তবে নেটো এবং রাশিয়া কীভাবে পরিস্থিতি ভাল করার চেষ্টা করবে সেটাও দেখার বিষয়। পুতিন বলেছেন, তিনি প্রথমে কি শুনেছেন সেটা নিয়ে চিন্তা করবেন, তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন।
অ্যাডামস বলেন, এটা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো। যেন যুক্তরাষ্ট্র পারলে তাকে (পুতিন) থামিয়ে দেখাক।