Published : 21 Sep 2025, 03:27 PM
ইসরায়েলি গণহত্যা ও গাজায় নির্মম অভিযানের মধ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্থানীয় সময় রোববার বিকালে এক বিবৃতিতে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন বলে বিবিসি জানিয়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি ও ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুতি দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি শর্ত তেল আবিব পূরণ না করলে যুক্তরাজ্য তার অবস্থান বদলাবে বলে এ বছরের জুলাইয়েই স্টারমার আভাস দিয়েছিলেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণে এক হাজার ২০০ লোক নিহত ও আড়ইশ জনের মতো জিম্মি হওয়ার পর ইসরায়েলের নেতারা গাজায় তাদের অভিযানের শুরু থেকেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে এসেছেন।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নতুন অবস্থান এরই মধ্যে ইসরায়েলি সরকার, গাজায় জিম্মি থাকা লোকদের পরিবার ও অনেক রক্ষণশীলের সমালোচনা কুড়িয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে বলেছিলেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হচ্ছে ‘সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করা’।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার এ সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র নীতিতে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে একাধিক সরকার বলেছিল, শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি আসা উচিত এবং এমন সময়ে দেওয়া উচিত যখন এর প্রভাব থাকবে সর্বাধিক।
কিন্তু বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের যুক্তি হচ্ছে, ওই অঞ্চলের এখনকার যে পরিস্থিতি তাতে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির আশা বাঁচিয়ে রাখতে নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান তো ছাড়, গাজায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিতের চেষ্টাগুলোও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ইসরায়েল সম্প্রতি কাতারে হামাসের আলোচক দলের ওপর হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র নিন্দাও কুড়িয়েছে।
অনাহার ও সহিংসতার নানান ছবি উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সরকারের একাধিক সূত্র গত কয়েক সপ্তাহে গাজার পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছে। কিয়ার স্টারমার আগেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটির পরিস্থিতিকে ‘অসহ্য’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
গাজা সিটিতে ইসরায়েলের সর্বশেষ স্থল অভিযান এরই মধ্যে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা ইসরায়েলি এ অভিযানকে ‘প্রলয়ঙ্করী’ আখ্যা দিয়েছেন।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি যুদ্ধ এরই মধ্যে গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে, ভূখণ্ডটির সিংহভাগ অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৫ হাজার ২০৮ জনের প্রাণও গেছে বলে জানিয়েছে হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
দিনকয়েক আগে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন তাদের সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। তেল আবিব একে ‘বিকৃত ও মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে।
দখলকৃত পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইসরায়েল যেভাবে বসতির বিস্তার ঘটাচ্ছে তা নিয়েও আপত্তি আছে ব্রিটিশ মন্ত্রীদের। এই বসতি সম্প্রসারণও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
স্বীকৃতির আগে বিতর্কিত ই১ বসতি প্রকল্প এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেটলারদের সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের আপত্তির বিষয়টি ফের তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ আইনমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি।
ই১ বসতি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা টেকসই ও অবিচ্ছিন্ন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আশায় জল ঢেলে দেবে বলে সমালোচকরা সতর্ক করছেন।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব যখন উঠেছিল, ল্যামি তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। চলতি মাসেই তাকে স্টারমার উপপ্রধানমন্ত্রী করেছেন, সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়েছে।
পর্তুগাল, ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ারও খুব শিগগিরই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা।
জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ দেশই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র মানে, কিন্তু দেশটির কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা, রাজধানী বা সৈন্য না থাকায় এ স্বীকৃতি মূলত ‘প্রতীকী’।
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ যে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাতে পশ্চিম তীর ও গাজা ভূখণ্ড নিয়েই একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, যার রাজধানী হওয়ার কথা পূর্ব জেরুজালেম।
গাজা ও পশ্চিম তীর দুটোই এখন ইসরায়েলের দখলে রয়েছে, যার মানে নিজেদের ভূখণ্ড বা জনগণের ওপর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে লেবার পার্টির অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ইসরায়েল প্রসঙ্গে কঠোর অবস্থান নিতে স্টারমারকে লেবার পার্টির সিংহভাগ এমপি, বিশেষ করে বামপন্থি অংশের তুমুল চাপের মুখেও পড়তে হয়েছে।