Published : 19 Jun 2026, 12:19 PM
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে সই করার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নিয়েছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এক্স পোস্টে বলেছে, ‘প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী’ অবরোধ শেষ হয়েছে। কিছু মার্কিন জাহাজ এখনো ওই এলাকায় থাকবে।
বিবিসি লিখেছে, এর পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি বলেন, ‘ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি’ থাকার পরও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি অনুমোদন করেছেন।
মুজতাবা জানান, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ‘ইরানি জাতির অধিকার রক্ষা করবেন’ বলে নিশ্চয়তা দেওয়ার পর তিনি চুক্তিটিকে এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো উপায় না দেখে এই চুক্তি করার জন্য ‘সব ধরনের চাপ ও হাতিয়ার’ ব্যবহার করেছেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সামনাসামনি আলোচনা হলেও তার মানে এই নয় যে তারা শত্রুর শর্ত বা অবস্থান মেনে নেবেন।
বিবিসি লিখেছে, চুক্তিটি নিয়ে খামেনি এই প্রথম কোনো মন্তব্য করলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন; এরপর পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মার্চ মাসে মুজতাবা উত্তরসূরি নির্বাচিত হলেও তাকে আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি।
মুজতাবার বক্তব্যের সরাসরি কোনো জবাব দেননি ট্রাম্প। তবে ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলসহ ‘সব যুদ্ধক্ষেত্রে’ একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে বলে আশা করছেন।
সেই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ‘তাদের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে’ বলেও আশা প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই চুক্তি হয়েছে মোটাদাগে ১৪টি বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া, ইরানের কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার শর্ত এবং ইরানের ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে’ ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের প্রতিশ্রুতি, যদিও যুক্তরাষ্ট্রকে এ তহবিলে কোনো অর্থ দিতে হবে না।
এই চুক্তিতে উভয়পক্ষের সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে এই সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে শুক্রবার এ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা ছিল। তবে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান বিবিসিকে জানিয়েছে, দূর থেকেই (রিমোটলি) সই হয়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। অবশ্য পরবর্তী আলোচনার জন্য মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সুইজারল্যান্ডে বসার কথা রয়েছে।

হোয়াইট হাউজের একজন মুখপাত্র বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জানান, মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এদিন রাতে রওনা হচ্ছেন না।
এর আগে ভ্যান্স হোয়াইট হাউজে ব্রিফিংয়ে বলেন, চুক্তি কার্যকর হয়ে গেছে এবং পরবর্তী আলোচনার জন্য ৬০ দিনের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে গেছে।
‘কারিগরি আলোচনার’ জন্য সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি বলেন। তবে কবে যাবেন তা নিশ্চিত করেননি।
ইরান ‘সহজে বের হওয়ার মতো দেশ নয়’ মন্তব্য করে ভ্যান্স বলেন, কখন বৈঠক করা সম্ভব হবে তা বোঝার চেষ্টা করছেন তারা।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র বলেন, যত দ্রুত সম্ভব কারিগরি আলোচনা শুরু করার অপেক্ষায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিবিসি লিখেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে; যার মধ্যে চুক্তির শর্তাবলি, বিশেষ করে ইরানের জন্য পুনর্গঠন তহবিলের বিষয়টি দেখে হতাশ হওয়া রিপাবলিকানরাও রয়েছেন।
রিপাবলিকান সেনেটর বিল ক্যাসিডি এই চুক্তিকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুল’ আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি বলেন, “ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা কমানো যায়নি এবং তারা বুঝে গেছে যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিলে কাজ হয়।”
ভ্যান্স বৃহস্পতিবার এই চুক্তির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, চুক্তিতে নির্ধারিত বাধ্যবাধকতাগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান কোনো অর্থ বা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে না।
তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হিসেবে পরিচিত এ চুক্তির আওতায় ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংস করতে হবে এবং দেখাতে হবে যে, তারা এই অঞ্চলে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করছে না।
এই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্যরা সমালোচনা করায় তীব্র ভর্ৎসনা করেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, ‘জেগে উঠে’ বাস্তবতা বোঝা উচিত।
“আমি যদি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বের মধ্যে অবশিষ্ট থাকা একমাত্র শক্তিশালী মিত্রর ওপর সম্ভবত আক্রমণ করতাম না।”
নিউ ইয়র্ক টাইমসে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স এ চুক্তির সমালোচক হিসেবে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম বলেন।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি তাদের প্রতি আমার জবাব হবে—আপনাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব কী? আপনারা ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। আপনারা কেবল হত্যার মাধ্যমে আপনাদের প্রতিটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে পারেন না।”
নেতানিয়াহু নিজে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে বৃহস্পতিবার বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন তার দেশের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু মার্কিন-ইরান চুক্তি ঘোষণার পর থেকেই ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয়ই একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে বৃহস্পতিবার লেবাননে হওয়া হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের এই সংঘাত ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের চেয়ে আলাদা। হিজবুল্লাহও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির শর্তগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি ইসরায়েলকে সম্মান জানাতে হবে, যা তাদের জন্যই ভালো। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার মত হামলা ‘গ্রহণযোগ্য নয়’।