ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত: দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান কী, সমস্যা কোথায়?

গাজায় চলমান সংঘাত নিরসনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাধান দেখছে ওয়াশিংটন; তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের বিরোধীতা করে আসছেন।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 Jan 2024, 04:48 AM
Updated : 27 Jan 2024, 04:48 AM

গাজায় সাড়ে তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। দ্বি-রাষ্ট্রকেই শান্তির উপায় হিসেবে দেখছে অনেকে। যদিও শান্তির পথ এমনকি সমঝোতার প্রক্রিয়াও বছরের পর বছর ধরে রুদ্ধ হয়ে আছে।

ওয়াশিংটন বলছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা ইস্যু এবং গাজা পুনর্গঠনের যে চ্যালেঞ্জ, সেটি সমাধানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের পুরোপুরি বিরোধীতা করে আসছেন।

নেতানিয়াহু বলছেন, জর্ডান উপকূলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবেন না। তার এই অবস্থানই মূলত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দীর্ঘকাল ধরেই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে জেরুজালেম নিয়ে উভয় পক্ষের অনড় অবস্থান এবং দীর্ঘদিন ধরে চালানো সহিংসতা ও গভীর অবিশ্বাস।

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান

ফিলিস্তিন একসময় ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। সেসময় আরবদের সঙ্গে অন্য এলাকা থেকে আসা ইহুদিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ইউরোপ থেকে পালিয়ে আসা ইহুদিরা জেরুজালেমের সঙ্গে বাইবেলের যোগসূত্র ধরে সেখানে তাদের বসতি গড়ার পথ খুঁজছিল।

জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে দুই জাতির দ্বন্দ্বে ১৯৪৭ সালে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে ভাগ করে আরব ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল জাতিসংঘ। ইহুদি নেতারা সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, যা তাদের ৫৬ শতাংশ ভূমির অধিকার দেয়। কিন্তু আরব লীগ এই পরিকল্পনাকে প্রত্যাখ্যান করে।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। একদিন পর পাঁচ আরব রাষ্ট্র আক্রমণ করে বসে ইসরায়েলে। সেই যুদ্ধ শেষ হয় ৭৭ শতাংশ এলাকা বেদখল অর্থাৎ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার মাধ্যমে।

যুদ্ধে প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে শেষ পর্যন্ত জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ার পাশাপাশি গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে আশ্রয় নেয়। এরপর ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীরসহ পূর্ব জেরুজালেম জর্ডানের কাছ থেকে দখল করে নেয় এবং মিশরের কাছ থেকে দখল করে নেয় গাজা। ভূমধ্যসাগর থেকে জর্ডান উপত্যকা পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষিত করে।

ফলে ফিলিস্তিনিরা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। বেশিরভাগই তখন ইসরায়েল অধিকৃত এলাকা কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। কেউ আবার ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর সেখানেই থেকে যায় এবং ইসরায়েলের নাগরিকত্ব পায়।

আর কী পদক্ষেপ ছিল?

যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি ছিল দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি অনুযায়ী এই সমাধানের কথা বলা হয়। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন এই চুক্তিতে সই করেন।

চুক্তি অনুযায়ী সহিংসতা পরিহার করে ইসরায়েলের অস্ত্বিত্বকে স্বীকৃতি দেয় পিএলও। সেইসঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) গঠনও হয়; যাদের পশ্চিম তীর ও গাজা ভূখণ্ডে সীমিত স্বায়ত্তশাসন রয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাশা ছিল, এটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি পদক্ষেপ হবে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া থেকে উভয়পক্ষ প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সহিংতা বেড়ে যায়। হামাস ওই পরিকল্পনার বিরোধীতা করে আত্মঘাতী হামলা চালায়। অনেক মানুষ মারা যায়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী রবিন ১৯৯৫ সালে এক ইহুদি উগ্র জাতীয়তাবাদীর হাতে খুন হন। ওই ব্যক্তি রবিনের শান্তি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ছিল।

এরপর ২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাককে ক্যাম্প ডেভিডে একটি চুক্তি জন্য ডাকেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

জেরুজালেমকে ইসরায়েল রাজধানী করায় প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সীমানা বন্টন নিয়ে সমস্যা ছিল। এরপর দ্বিতীয় ইন্তিফাদার শুরু হলে সংঘাত বেড়ে যায়। মার্কিন প্রশাসন ফের শান্তি প্রতিষ্ঠা পদক্ষেপ নিলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা যারা বলছেন, তাদের ভাবনা অনুযায়ী ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে। ইসরায়েলের সঙ্গে একটি কোরিডোরের মাধ্যমে সংযোগ হবে। দুই দশক আগে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের নেতাদের আলোচনায় এ ব্যাপারে বিশদ বিবরণ এসেছিল।

আলোচনায় নতুন পথ খোলে ‘জেনেভা অ্যাকর্ড’। সেখানে বলা হয়, জেরুজালেমের ইহুদি বসতি এলাকা হবে ইসরায়েলের রাজধানী। অপরদিকে জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি বসতি এলাকা হবে ফিলিস্তিনের রাজধানী। ইসরায়েল বড় বসতি এলাকাগুলো সংযুক্ত করবে এবং বিনিময়ে অন্য জমি ছেড়ে দেবে। ওই এলাকার বাইরে ফিলিস্তিনের সার্বভৌম ভূখণ্ডে ইহুদিদের পুনর্বাসন করবে।

সেইসঙ্গে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি একটি বহুজাতিক বাহিনী ফিলিস্তিনের সঙ্গে জর্ডান ও মিশরের সীমান্ত ক্রসিং এবং বিমান ও সমুদ্র বন্দরগুলো পর্যবেক্ষণ করবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি উভয়েই একটি অসামরিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণার কথা বলেন। এমন ধারণা ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের নেতা মাহমুদ আব্বাস কখনো প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান বা গ্রহণও করেননি। তবে হামাস এটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

সমস্যা কত বড়

সময় যত গড়াচ্ছে, সমস্যাও তত বাড়ছে। ২০০৫ সালে গাজা থেকে ইহুদি বসতি ও সেনাদের সরিয়ে নিলে ইহুদিরা অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনিরা তখন জানায়, এটি কার্যকর রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ন করে।

ইসরায়েলের সংগঠন ‘পিস নাউ’ গত বছরের সেপ্টেম্বরে জানায়, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১৯৯৩ সালে জনসংখ্যা ছিল আড়াই লাখ। তিন দশক পরে তা বেড়ে হয় প্রায় ৭ লাখ। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় আরও পুনর্গঠন করে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিরা একে ভূমি দখল বলে অভিহিত করে।

অসলো চুক্তি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পশ্চিম তীর এলাকা, যার ৬০ শতাংশ ভূখণ্ডই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জর্ডান সীমান্ত এলাকাও রয়েছে সেখানে। পশ্চিম তীরে ‘এরিয়া সি’ এলাকায় ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

‘এরিয়া এ’-তে রয়েছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের বেসামরিক বিষয় এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়াদি। ফিলিস্তিনের প্রধান শহরগুলো সেখানে। এছাড়া ‘এরিয়া বি- নামে আরেকটি ভাগ রয়েছে, যেখানে বেসামরিক বিষয়গুলো পরিচালনা করা হয় এবং সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে থাকে ইসরায়েল। যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের এলাকা রামাল্লাসহ নগরগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালিয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, জটিলতা আরও বাড়িয়েছে উভয়পক্ষের রাজনীতি। ইসরায়েলের ইতিহাসে নেতানিয়াহুর সরকার সবচেয়ে ডানপন্থী, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী। অপরদিকে হামাস ২০০৬ সালের নির্বাচনে জিতে এক বছর পর গাজা থেকে আব্বাসের অনুগত বাহিনীকে বের করে দেয়। এতে বিভক্ত হয়ে পড়ে ফিলিস্তিনিরা।

হামাসের ১৯৮৮ সালের চার্টারে ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেই সনদে।

হামাস নেতারা ১৯৬৭ সালে বেদখল হওয়া ভূখণ্ড ফিরিয়ে নিয়ে সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিনিময়ে ইসরায়েলকে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে মাঝে মধ্যে। তবে ইসরায়েল এটিকে কেবল একটি কৌশল বলেই মনে করে।

উপায় কী

গত বছরের ৭ অক্টোবরের আক্রমণের পর থেকে হামাসকে পুরোপুরি নির্মূলের লক্ষ্যে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু বলছেন, গাজাকে অবশ্যই নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং ইসরায়েলের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

আবার এও বলেছেন, তিনি চান না ইসরায়েল গাজা শাসন করুক বা সেখানে বসতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুক।

এমন অবস্থায় গাজায় লড়াইয়ে টিকে থাকার কথা জানিয়ে হামাস বলেছে, তাদের বাদ দিয়ে গাজার জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থার কল্পনা হবে অলীক। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটি বলছে, ঐক্যমতের সরকার গঠনের জন্য আব্বাস-ফাত্তাহর উপগোষ্ঠী বা দলের সঙ্গে আলোচনার জন্য তারা প্রস্তুত। কিন্তু এর আগে এমন আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।

হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে দেখা ওয়াশিংটন বলছে, তারা গাজা ও পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শাসনের অধীনে দেখতে চায়। আর নেতানিয়াহু জানান, তিনি জর্ডান নদীর পশ্চিমে ইসরায়েলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেবেন, যেটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাধা।

আব্বাসের এক মুখপাত্র বলেন, নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রমাণ করে ইসরায়েল ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতায় আগ্রহী নয়’। হামাসের এক কর্মকর্তা ওসামা হামদান ২২ জানুয়ারি বলেন, রাজধানী জেরুজালেমসহ সার্বভৌম রাষ্ট্রের চেয়ে কম কিছু মেনে নেবে না ফিলিস্তিনিরা।

বিকল্প কী তাহলে?

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথ যখন ব্যাপক জটিলতায় আটকে আছে, তখন একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথাও উঠছে। অনেক ফিলিস্তিন নিশ্চিত যে, ইসরায়েল কখনই তাদের সার্বভৌমত্ব দেবে না। ফলে ইসরায়েলের অংশে এবং ১৯৬৭ সালে বেদখল হওয়া ভূমিতে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কথা বলছে তারা।

তবে সমালোচকরা বলছেন, সেটি অবাস্তব। প্রধান ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী বা দলগুলো এটিকে সমর্থন করে না। আর ইসরায়েলও সেটিকে কখনই গ্রহণ করবে না, যা তাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২৩ জানুয়ারি বলেছেন, এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হল দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান। এই সমাধানের পথ ইসরায়েলের বারবার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানের সমালোচনা করেন তিনি।

গুতেরেস বলেন, “দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান প্রত্যাখ্যান ফিলিস্তিনি জনগণের রাষ্ট্রের অধিকারকে অস্বীকার করে। একটি সংঘাতকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত করে, যা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।”