Published : 27 Jun 2026, 01:17 PM
যুদ্ধবিরতির সমঝোতার পর স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চলার মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে।
আল জাজিরা লিখেছে, শুক্রবার একটি পণ্যবাহী জাহাজে ‘ড্রোন’ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে হামলা শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড-সেন্টকমের ভাষায়, ‘শক্তিশালী পাল্টা হামলা’ চালানো হয়েছে।
সেন্টকম বলেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণ এলাকা এবং উপকূলীয় রেডার স্থাপনাগুলোতে বিমান হামলা করেছে মার্কিন বাহিনী।
বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’ ড্রোন হামলার শিকার হয়।
আল জাজিরা লিখেছে, ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, পাল্টাপাল্টি এই হামলার ঘটনা সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা হামলা চালায়। বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এরপর হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যে মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে দুই দেশ সম্মত হলেও হরমুজ প্রণালি অচল ছিল।
সবশেষ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি সমঝোতা হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হয়। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনাও শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা। এর মধ্যেই নতুন করে হামলা পাল্টা হামলা হল।
এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, “যখন আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে বাণিজ্য প্রবাহ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে, তখন ইরানের বিপজ্জনক আচরণ নৌযান চলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকিতে ফেলেছ।”
ঘোষণার পর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর সিরিকের কাছে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এর পরেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর-আইআরজিসি বলেছে, মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলা জবাবে তারা ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সরকারি বার্তা ইরনা বলেছে, এক বিবৃতিতে আইআরজিসি হুঁশিয়ার করে বলেছে, “বারবার আগ্রাসনের ঘটনায় এখনকার তুলনায় আমাদের হামলা হবে আরো বেশি বিস্তৃত।”
আল জাজিরা লিখেছে, ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেখানে
যুদ্ধবিরতির ধারা যুক্ত রয়েছে। সমঝোতার এই চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য দুই দেশই পরস্পরকে দায়ী করছে।
এই চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধের ঘোষণা রয়েছে, যাকে ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা কার্যকরভাবে বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত না হলেও তা যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার প্রাথমি কাঠামো। সেখানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিয়েও ভবিষ্যৎ আলোচনার কথা বলা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেল, সার ও অন্যান্য পণ্যের দামে উল্লফন ঘটে।
বৃহস্পতিবার হামলা ঘটনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ফের উসকে দিয়েছে।
পরদিন শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ‘এভার লাভলি’ জাহাজে হামলাকে তিনি সমঝোতা স্মারকের ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ৬০ দিন ইরান কোনো মাশুল ছাড়াই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেবে।
যদিও ভঙ্গুর এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এখন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে ইসরায়েলের কারণে। দেশটি সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে লেবাননে বোমা হামলা করে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে ইরান গত সপ্তাহে বলেছে, লেবাননে হামলা বন্ধ না হলেও তারা হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেবে।
বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে ‘এভার লাভলি’ জাহাজে হামলায় কোনো নাবিক হতাহত হওয়ার খবর মেলেনি এবং জাহাজ তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
তবে এই হামলার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে দায়ী করে বলেছেন, “হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেওয়ার সময় জাহাজগুলোতে চারটি একমুখী হামলাকারী ড্রোন ছোড়া হয়েছে।”
তার দাবি, মার্কিন বাহিনী তিনটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে, অন্যটি জাহাজে আঘাত করেছে।
ডনাল্ড ট্রাম্প ‘এভার লাভলি’ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে দাবি করেছেন, “ড্রোনগুলোর একটি বড় ও খুব দামি একটি পণ্যবাহী জাহাজের ওপরের ডেকে আঘাত করেছে।”
এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, ১৭ জুনের সমঝোতা এখনো কী অক্ষুণ্ন আছে?
জবাবে তিনি বলেন, “গতকাল তারা হামলা চালিয়েছে—বিষয়টি আমার পছন্দ হয়নি।” এরপর তিনি সংক্ষেপে ‘এভার লাভলি’ জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরে বলেন, “এটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের এমনটি করা উচিত নয়। এর পরিণতি কী হয়, তা আপনারা দেখতে পাবেন।”
শুক্রবার সেন্টকম নিশ্চিত করেছে যে ট্রাম্প প্রশাসন ‘এভার লাভলি’ জাহাজে হামলার ঘটনাকে ওই সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
“বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানি বাহিনীর অনাকাঙ্ক্ষিত এই হামলা যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
“তাছাড়া “যখন আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে বাণিজ্য প্রবাহ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে, তখন ইরানের বিপজ্জনক আচরণ নৌযান চলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকিতে ফেলেছ।”
সকল বাণিজ্যি জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ রাখতে মার্কিনী বাহিনী তাদের অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরে। তাছাড়া তারা সমঝোতা স্মারক মেনে চলতে সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হুঁশিয়ার করে বলেছেন, “সহিংসতার জবাবে সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।”
সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছে, “ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, আমরা সেটিকে সম্মান করি। যদি “সমঝোতা স্মারকের প্রয়োগ নিয়ে কোনো আপত্তি বা মতবিরোধ থাকলে সেটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।”