Published : 27 Feb 2026, 06:00 PM
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি শুক্রবার ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই পৌঁছেছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই কার্নির প্রথম ভারত সফর।
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের তিক্ত সম্পর্ক মিটিয়ে নতুন বৈশ্বিক জোট গড়ার লক্ষ্যে এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
মুম্বাইয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে কার্নি একটি ব্যাপকভিত্তিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করবেন, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কার্নির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একথা জানিয়েছেন। এরপর তিনি নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ এবং কানাডা দখলের হুমকির মুখে মার্ক কার্নি আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাইছেন।
তিনি এই নতুন বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তির দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কানাডা ও ভারতের সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল কয়েকবছর আগে। কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সেদেশে এক শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলায় পর দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।
ভারত বরাবরই হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ট্রুডো আমলে কানাডায় অশান্তির পেছনে ভারতকে দায়ী করা হলেও সম্প্রতি সুর বদলেছে কানাডা। দেশটিতে অশান্তি ও সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে ভারত আর জড়িত নয় বলা হচ্ছে।
তাছাড়া, ট্রুডো বা অন্যান্য কানাডীয় নেতাদের মতো কার্নি এবার ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য সফর করছেন না। পাঞ্জাব থেকে কানাডায় অভিবাসনের হার সবচেয়ে বেশি হলেও সেখানে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি ভারতের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কার্নি ভারতের অভ্যন্তরীন রাজনীতি বা প্রবাসীদের তুষ্ট করার চেয়ে কানাডার অর্থনীতিতে পুঁজি আকর্ষণের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন।
বিজনেস কাউন্সিল অব কানাডার প্রেসিডেন্ট গোল্ডি হায়দার বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য এখন কানাডায় বিনিয়োগ আনা, দেশের ভেতরে থাকা ভারতীয় প্রবাসীদের নিয়ে নাড়াচাড়া করা নয়। এটি একটি ব্যবসায়িক সফর যা ট্রুডো আমলের তুলনায় এক বিশাল পরিবর্তন।”
সম্ভাব্য চুক্তি ও সহযোগিতা:
গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তির পর কানাডাও একই পথে হাঁটতে চাইছে।
অটোয়ায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার জানুয়ারিতে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, এই সফরে কার্নি ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের (২.০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) একটি ১০ বছর মেয়াদী ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তি সই করতে পারেন।
এছাড়া তেল-গ্যাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক ছোট ছোট আরও কিছু চুক্তি হতে পারে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পার্থ মোহনরাম বলেন, “কার্নি একজন অত্যন্ত কৌশলী নেতা। ২০১৮ সালে ট্রুডোর সফরের মতো তিনি ভারত সফরকালে অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরা বা ভাঙরা নাচে মাতবেন না।”
নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য রোধ:
তবে কার্নির এই ভারত সফর কানাডার শিখ সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড শিখ অর্গানাইজেশন’ অভিযোগ করেছে যে, শিখদের ওপর বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকাতে কার্নি সরকার ভারতকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ জানিয়েছেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রবাসীদের ডিজিটাল হুমকি ও নজরদারি থেকে রক্ষায় নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ভারত সফর শেষে কার্নি অস্ট্রেলিয়া ও জাপান সফর করবেন। তার এই সফরের মূল আলোচ্যসূচি হল, নীতিগত ও বাস্তবমুখী পথে হেঁটে আমেরিকার একক আধিপত্য থেকে কানাডার অর্থনীতিকে রক্ষা করা এবং বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনা।