Published : 24 Feb 2026, 07:36 PM
ইউক্রেইনে যুদ্ধের শুরুর দিকে ভারি সাঁজোয়া যানগুলো যেভাবে মুখোমুখি লড়াইয়ে লিপ্ত হত, চার বছরব্যাপী যুদ্ধে সেই দৃশ্যপট এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেইনের ট্যাঙ্ক প্লাটুন কমান্ডার ভ্যালেন্টিন বোহদানভ এখন অনুভব করছেন, রণক্ষেত্রের আকাশে ক্ষুদ্র কিন্তু বিধ্বংসী ‘ফার্স্ট-পারসন-ভিউ’ ড্রোনের আধিপত্য সাঁজোয়া যানের চলাচলকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ইউক্রেইনের ১২৭ ভারি যন্ত্রপাতির খারকিভ ব্রিগেডের ঊর্ধ্বতন সার্জেন্ট বোহদানভ জানান, রাশিয়ার কাছ থেকে দখল করা তার টি-৭২ ট্যাঙ্কটি এখন উত্তর-পূর্ব খারকিভ অঞ্চলের বরফঢাকা সম্মুখসারির কাছে জাল দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে থাকে।
এক সময়ের সচল এই সমরযান এখন কেবল একটি স্থির কামানের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর প্রযুক্তি যেভাবে সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে, তাতে দুই পক্ষকেই নতুনভাবে রণ পরিকল্পনা সাজাতে হয়েছে।
১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্রন্ট লাইনের আকাশে এখন কয়েকশ ডলার মূল্যের হাজার হাজার প্রিসিশন ড্রোন বিচরণ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও শক্তিশালী এবং ভারি সরঞ্জাম বহনে সক্ষম দীর্ঘ পাল্লার ড্রোন।
আকাশে এই ড্রোন হুমকির কারণে কার্যত সেনা কিংবা সামরিক যানের কোনওরকম নড়াচড়া অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
‘ফরাসি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস’-এই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ড্রোনের আঘাতে হতাহতের হার ১০ শতাংশের নিচে থাকলেও গত বছর তা লাফিয়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।
অবরুদ্ধ কন্সট্যান্টিনিভকা শহরের কাছে রয়টার্স সম্প্রতি যে ভ্রাম্যমান ড্রোন শিকারি দল দেখেছে, তেমনটি এখন অহরহই দেখা যাচ্ছে।
জালের মতো অ্যান্টি-ড্রোন নেট দিয়ে ঢাকা রাস্তাগুলোতে তারা ছোট এফপিভি থেকে শুরু করে দীর্ঘ পাল্লার ‘শাহেদ’ ড্রোনের সন্ধানে সদা সতর্ক থাকে। যুদ্ধের সম্মুখসারিতে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার মুখে সেনাদের রসদ সরবরাহের পথগুলো রক্ষা করা তাদের কাজ।
৯৩তম মেকানাইজড ব্রিগেডের ড্রোন শিকারী ‘মেরিন’ জানান, তিনি এক ঘণ্টার মধ্যে একটি লক্ষ্যবস্তুতে ৫৪টি ড্রোন হামলা হতে দেখেছেন।
তিনি বলেন, “তিনটি ড্রোন ঘিরে ধরবে, আরেকটি হামলা করবে এবং অন্য আরও ড্রোন তাতে যোগ দেবে। ড্রোনগুলো সবসময় আকাশে থাকে, কাউকে পালানোর সুযোগ দেয় না।”
ড্রোন পাইলট হিসেবে কাজ করা ৪২ বছর বয়সী আন্দ্রি মেসকভ জানান, এফপিভি ড্রোনের গতি ও ক্ষিপ্রতার সামনে মানুষের দৌড়ে পালানোর কোনো সুযোগ নেই। এমনকি রাইফেল হাতে তুলে ড্রোনকে গুলি করার সময়টুকুও পাওয়া যায়না।
মেসকভ ও তার দুই কমরেড ড্রোন হামলার শিকার হয়েছিলেন। একটি ড্রোন মেসকভের হেলমেটে ধাক্কা লেগে পায়ের কাছে বিস্ফোরিত হলে তার হাঁটু ভেঙে যায়। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ইউক্রেইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরোভ গত সপ্তাহে বলেছেন, রাশিয়া জানুয়ারিতে ৭ হাজারের বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তিনি জানান, ইউক্রেইন এবছর তাদের ড্রোন উৎপাদন এবং সংগ্রহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।
রণক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় হতাহতদের উদ্ধার করাও এখন কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খারকিভ হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক কর্নেল ভিয়াচেস্লাভ কুরিনি জানান, ড্রোনের হুমকির কারণে আগে যেখানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা এক ঘণ্টার মধ্যে আহত যোদ্ধাদের উদ্ধার করা সম্ভব হত, এখন সেখানে সময় লাগছে গড়ে তিন দিনেরও বেশি।
এমনকি কুরিনির হাসপাতালে এমন সেনাকেও উদ্ধার করে আনা হয়েছে যিনি দুই মাস ধরে রক্ত বন্ধ করার ব্যান্ডেজ পরে আটকে ছিলেন।
আহতদের উদ্ধার, রসদ সরবরাহ এবং হতাহতের সংখ্যা কম রাখতে এখন ড্রোনের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মানববিহীন স্থলযান ব্যবহার করা হচ্ছে।
ট্যাঙ্ক কমান্ডার বোহদানভ মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্যাংকের গুরুত্ব কমে আসছে এবং দীর্ঘ পাল্লার কামানের ওপর বেশি জোর দেওয়া উচিত।
তবে সামরিক বিশ্লেষক রব লি মনে করেন, ট্যাঙ্ককে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলার সময় হয়নি। পরিবর্তন দ্রুতগতিতে ঘটতে থাকার কারণে কৌশল শিগগিরই আবার বদলাতে পারে।
তিনি বলেন, “এমুহূর্তে বর্তমান রণকৌশলের ভূমিকা ম্লান হয়েছে। আর আমরা আবার রণকৌশল পরিচালনায় সক্ষম হতে আগামী দিনগুলোতে যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অপেক্ষায় আছি।”