Published : 30 Mar 2026, 11:44 PM
ইরান যুদ্ধে ইয়েমেনের হুতিদের বহুল প্রতীক্ষিত যোগ দেওয়ার প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করছে একটি বিষয়ের ওপর। তেহরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি কি কেবল দূর থেকে ইসরায়েলের দিকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ছুড়েই ক্ষান্ত হবে, নাকি তারা নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধ করে দেবে?
ইরান যেভাবে ইতিমধ্যেই কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, হুতিরাও যদি সেভাবে লোহিত সাগরকে অবরুদ্ধ করে ফেলে, তবে সেটিই হবে বড় চিন্তার বিষয়।
ইরান বা হুতিদের অপছন্দের দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য যদি এই দুটি জলপথই বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব হবে বিপর্যয়কর।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট একবার বলেছিলেন, “একটি রাষ্ট্রের নীতি তার ভূগোলের মধ্যেই নিহিত থাকে।” তার এই মন্তব্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য।
অদম্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি:
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানীসহ বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসা হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী একটি শিয়া সম্প্রদায়, যাদের মনে ইসরায়েলের প্রতি গভীর ঘৃণা রয়েছে।
তারা অত্যন্ত জটিল এবং প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম একটি গোষ্ঠী। ২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এক হামলায় হুতিদের প্রধানমন্ত্রী, চিফ অব স্টাফ এবং একদল ক্যাবিনেট মন্ত্রী নিহত হলেও ইসরায়েল কখনো গোষ্ঠীটির মূল নেতা আব্দুল মালিক আল-হুতির অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি।
জাতিসংঘ প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের অধিকাংশ অস্ত্র তেহরান থেকে এলেও তারা এ পর্যন্ত সরাসরি ইরানের পক্ষে লড়েনি।
ওমানের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের মে মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হুতিদের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে মার্কিন জাহাজে চালানো হামলার অবসান ঘটিয়েছে।
হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলোর ওপর মার্কিন ও ব্রিটিশ হামলার ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতি করে।
তবে হুতিরা বারবারই স্পষ্ট করেছে যে, এই যুদ্ধবিরতি কোনোভাবেই ইসরায়েলের জন্য প্রযোজ্য নয় এবং এরপরও কিছু হামলা অব্যাহত ছিল।
কৌশলগত অবস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি:
এই যুদ্ধবিরতির পেছনে একটি কৌশল ছিল। আর তা হল ২০২৫ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারমাণবিক আলোচনার আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে আনার তেহরানের ইচ্ছা।
এরপর অক্টোবর ২০২৫-এ ইসরায়েল যখন গাজায় হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, তখন হুতিরাও তাদের যুদ্ধবিরতি বাড়িয়েছিল। গত বছর ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও হুতিরা অনেকটা সংঘাত থেকে দূরে ছিল।
এর ফলে মায়েস্ক-এর মতো বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে লোহিত সাগর দিয়ে যাতায়াত শুরু করেছিল, যাতে তাদের আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ ঘুরে দীর্ঘ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল পথ পাড়ি দিতে না হয়।
ইয়েমেন এবং হর্ন অফ আফ্রিকার মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি সব সময়ই হুতিদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছোট নৌকার হামলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।
অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব:
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমী সতর্ক করে বলেছেন যে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে কোনো দীর্ঘমেয়াদী বিঘ্ন ঘটলে জাহাজ ভাড়া বাড়বে, তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং হরমুজ প্রণালি সংকটে জর্জরিত বিশ্ব অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়বে।
ফারেয়া মনে করেন, হুতিদের এ যুদ্ধে জড়িত হওয়া আরেকটি বিষয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তা হল: ওই অঞ্চলজুড়ে ইরানের নিজেদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার বিস্তৃত কৌশল প্রকাশ পেতে শুরু করেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
তাছাড়া, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে এমন ধারণাও জন্মাতে পারে যে, হুতিরা ইরানের প্রতি অতি মনোযোগী। তবে হুতিরা বর্তমানে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ, তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ বা পুরস্কার পাওয়ার আশা করছে।
ইয়েমেনের দক্ষিণে সৌদি আরব বর্তমানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি) অনেকটাই কোণঠাস করে ফেলেছে। এসটিসিকে সমর্থন দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।
রিয়াদের চাপে এ বছরের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইয়েমেন ত্যাগ করেছে। ফলে সৌদি আরব এখন ইয়েমেনের ভবিষ্যতের একমাত্র নিয়ন্ত্রক। এটি রিয়াদের জন্য একটি কঠিন কাজ, যার জন্য তাদের শুধু এসটিসি নয়, হুতিদের সঙ্গেও চুক্তিতে আসতে হবে।
এসটিসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলেও তারা এখনও অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এবং তারা এখন ইয়েমেনে রিয়াদ ও জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকারকে ব্যর্থ হতে দেখার অপেক্ষায় আছে।
এসটিসি মনে করে তাদের আন্দোলন এখনও শক্তিশালী। তবে সৌদি আরব এখন অনেকগুলো ফ্রন্টে লড়াই করার সামর্থ্য রাখে না, তাই তারা হুতিদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে চুক্তি করার চেষ্টা করবে, যাতে লোহিত সাগরে জাহাজের ওপর হামলার ঝুঁকি কমানো যায়।
সৌদি আরব ইয়েমেনের দক্ষিণের নতুন সরকারে প্রচুর অর্থ ঢালছে। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখা হুতিরাও হয়ত পুনরায় যুদ্ধ শুরু না করা বা লোহিত সাগরে বিশৃঙ্খলা না করার বিনিময়ে সেই অর্থের ভাগ চাইতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত হুতিদের মূল শক্তি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় নয়, বরং সমুদ্রপথের জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত। এর ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইয়েমেন শান্তি থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।
জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, “এই উত্তেজনা ইয়েমেনকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। যে যুদ্ধ ইয়েমেনের অভ্যন্তরীন সংঘাত মেটানো আরও কঠিন করে তুলবে, অর্থনৈতিক সংকট গভীর হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে।”