চিলিতে নির্বাচন: বামরা ফের ক্ষমতায়, নাকি ফিরবে দক্ষিণপন্থিরা?
জরিপে ক্ষমতাসীনদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে ডানপন্থিদের জোট তাকে বিপাকে ফেলতে পারে।
তিন বছর আগে গ্যাব্রিয়েল বরিক যখন চিলির প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন, তখন তার সমর্থকরা সেটিকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নতুন যুগের সূচনা মনে করেছিলেন।
জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া নিয়ে একের পর এক বিক্ষোভের ঢেউ বামপন্থি এ নেতাকে সেসময় ক্ষমতায় বসাতে পেরেছিল, তাও মাত্র ৩৬ বছর বয়সে।
তিনি স্বৈরাচার অগাস্তো পিনোশের আমলের সংবিধান বদলে ফেলারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা লাতিন আমেরিকার দেশটিকে বাজার অর্থনীতির জালে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিল।
কিন্তু কয়েক বছরে একাধিকবার চেষ্টা করেও ওই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি বরিক; অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢেউ এবং ক্রমবর্ধমান অপরাধ দেশটিতে দক্ষিণপন্থিদের অবস্থানও আগের তুলনায় শক্তিশালী করেছে। এসবই দেশটিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে বলে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বরিক একবারের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকতে পারছেন না। তার দল ও মিত্ররা মোটামুটি কমিউনিস্ট প্রার্থী হেনেত্তে হারার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। ডানরা বহুধাবিভক্ত। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দ্বিতীয় রাউন্ডে গেলে তাদের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রোববার প্রথম রাউন্ডে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে গেলে তিনিই আগামী বছরের ১১ মার্চ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে পারবেন। তা না হলে ফল নির্ধারিত হবে দ্বিতীয় রাউন্ডে, আগামী ১৪ ডিসেম্বর।
তবে রোববার কেবল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডই হচ্ছে না, এদিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ চেম্বার অব ডেপুটিজের ১৫৫ আসনের সবগুলো এবং উচ্চকক্ষ সেনেটের ৫০ আসনের ২৩টিতেও ভোট হবে।
২০১২-র পর এবারই প্রথম চিলিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাধ্যতামূলক ভোট দেওয়ার নিয়ম ফিরছে। যে কারণে এবার ভোটার উপস্থিতি বেশি হবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।
২০২১ সালের নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে ভোটারদের মাত্র ৪৭% তাদের রায় জানিয়েছিল।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চিলিতে এক কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৭ জন নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন।
প্রার্থী কারা
ক্ষমতাসীন জোট ইউনিটি ফর চিলির এবারের বাজি ৫১ বছর বয়সী হেনেত্তে হারা। বামপন্থি ৮ দলের জোটের প্রার্থী বাছাইয়ে জুনে তিনি ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।
বরিকের শ্রমমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এ নারী সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৪৫ থেকে ৪০ এ নামিয়ে আনার চেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও বাসস্থানের খরচ সাশ্রয়ী করাসহ জীবনযাত্রার খরচ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
চিলির রাজনীতিতে তার প্রার্থীতাকে ঐতিহাসিক বিবেচনা করা হচ্ছে। এর একটি কারণ, তিনি শ্রমিক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন, আর অন্যটি হচ্ছে দল। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কমিউনিস্ট পার্টির, চিলি গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করার পর দলটি এর আগে কখনোই এত সমর্থন দেখেনি।
অপরাধ দমনে আরও পুলিশ নিয়োগ এবং কারাগারের সংখ্যা বাড়ানোরও অঙ্গীকার আছে তার।
বাম জোট জুনে ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করলেও মধ্য-ডান ও কট্টর দক্ষিণপন্থিরা তার ধার ধারেনি। যে কারণে নভেম্বরে এসে তাদের একাধিক প্রার্থী ব্যালটে নাম লিখিয়েছেন।
তাদের মধ্যে এগিয়ে আছেন রিপাবলিকান পার্টির সাবেক কংগ্রেসসদস্য, ৫৯ বছর বয়সী হোসে আন্তোনিও কাস্ত। ২০২১ সালের নির্বাচনে বরিকের কাছে হেরেছিলেন এ কট্টর-ডানপন্থি। তবে এবার তার প্রস্তুতি ভালো এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছাতে পারলে অন্য ডানদের ভোটও টানতে পারবেন বলে অনেকে ধারণা করছেন।
নির্বাচনী প্রচারে কাস্ত অপরাধ ও অভিবাসন বিষয়ে তার কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নির্বাচিত হলে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের নীতি অনুসরণের কথাও বলেছেন।
প্রেসিডেন্ট হতে পারলে সরকারি ব্যয় কমানো, চিলিতে বিনিয়োগে কোম্পানিগুলোকে বড় ধরনের প্রণোদনা এবং বিপুল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনাও আছে তার।
কাস্ত তার প্রচারণায় সাবেক একনায়ক পিনোশের গুণগানও গেয়েছেন। পিনোশে ক্ষমতায় থাকাকালে, ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চিলি ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন, গুম-খুন দেখেছিল।
আরেক কট্টর-ডান প্রার্থী হোয়ানেস কাইজারকেও প্রথম পর্বের ব্যালটে দেখা যাবে। ৪৯ বছর বয়সী এ সাবেক ইউটিউবার ও চেম্বার অব ডেপুটিজের সদস্য ন্যাশনাল লিবারেটারিয়ান পার্টি থেকে লড়ছেন।
কাইজারের প্রতিশ্রুতি কাস্তের চেয়েও বেশি বাজার-বান্ধব। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে চিলিকে সরিয়ে আনতে চান। নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতিতে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও বেশি মানুষকে আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়ারও পক্ষে তিনি।
এদের বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন সাবেক রেডিও উপস্থাপক ও অর্থনীতিবিদ ফ্রাঙ্কো পারিসি, ব্যবসায়ী-বান্ধব মধ্য ডানপন্থি এভেলিন ম্যাথি।
জরিপ কী বলছে?
বেশিরভাগ জরিপেই প্রথম রাউন্ডে হেনেত্তে হারাকে এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। প্রায় সব জরিপেই তিনি গড়ে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেতে যাচ্ছেন বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হোসে আন্তোনিও কাস্ত, কট্টর-ডানপন্থি এ প্রার্থী পেতে পারেন ২০ শতাংশের সমর্থন। তার পেছনে থাকা কাইজার আর স্বতন্ত্র পারিসির সমর্থন দেখা যাচ্ছে ১০ থেকে ১৪ শতাংশের ঘরে। একই অবস্থা মধ্য-ডানপন্থি এভেলিন ম্যাথিরও।
দ্বিতীয় রাউন্ডে ডানদের সব ভোট যোগ হলে হারা যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে যাচ্ছেন, জরিপের ফলেই তার ইঙ্গিত আছে।
