Published : 19 Apr 2026, 07:56 PM
একদিকে ইরান যুদ্ধ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া মনোভাব, অন্যদিকে ইউক্রেইন সংকট ঘিরে বিশ্ব এখন নানামুখী ‘চ্যালেঞ্জের’ মুখে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সাম্প্রতিক চীন সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সের্গেই ল্যাভরভ গত ১৪-১৫ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, ইউক্রেইন সংকট ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।
ওয়াং ই-র সঙ্গে বৈঠকে ল্যাভরভ ইরান ও ইউক্রেইন যুদ্ধের পাশাপাশি বেইজিং ও মস্কোর গভীরতর হতে থাকা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।
অন্যদিকে শি জিনপিং এর সঙ্গে সাক্ষাতে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়া ও চীনকে ‘দৃঢ়ভাবে তাদের বৈধ স্বার্থ’ রক্ষা করতে এবং ‘গ্লোবাল সাউথভুক্ত’ দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান।
চেক প্রজাতন্ত্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংবাদসংস্থা রেডিও ফ্রি ইউরোপ বা রেডিও লিবার্টির খবরে বলা হয়, সের্গেই ল্যাভরভ এমন এক সময়ে বেইজিং সফর করলেন যখন ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে চীন তাদের ‘কূটনৈতিক তৎপরতা’ জোরদার করেছে।
ইরান যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ অবসান এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে পরমাণু কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও মতপার্থক্য বিদ্যমান।
শান্তি আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ‘কঠোর সামুদ্রিক অবরোধ’ আরোপ করলে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এমন পরিস্থিতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে।
১৪ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দেয়।
রেডিও ফ্রি ইউরোপ বলছে, শি জিনপিং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে আরও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করতে চাইছেন। ১৪ এপ্রিল শি আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালিদ বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ানকেও আতিথ্য দেন। সে সময় আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের কাছে উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করেন শি।
গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদন এবং খোদ ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে ধারণা হয়, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি আলোচনায় চীনের ভূমিকা ছিল। তবে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনার পেছনে বেইজিং ঠিক কতটা ভূমিকা পালন করেছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
চীনের এই ‘নানামুখী ভূমিকার’ মধ্যেই বিশ্ব রাজনীতির আরেক ‘বড় খেলোয়াড়’ রাশিয়ার প্রবেশ তাই গুরুত্ব সহকারে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চীন ইরান যুদ্ধের আবহে নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থান শক্ত করতে চাইছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘অস্থিরতা সৃষ্টিকারী শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ইউ জি বলেন, “চীন এই সংঘাতকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখবে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, চীন আন্তর্জাতিক বিষয়ে একটি স্থিতিশীল শক্তি এবং ‘বিশ্ব অক্ষের’ সবচেয়ে বিচক্ষণ সদস্য।”
রেডিও ফ্রি ইউরোপ লিখেছে, ধারণা করা হচ্ছে, ১৪-১৫ মে ট্রাম্প বেইজিং সফর করবেন এবং শি জিনপিং-এর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। তার আগে ল্যাভরভের সফর ভিন্নরকম গুরুত্ব বহন করছে।
ফাঁস হওয়া একটি ইরানি সামরিক নথির বরাত দিয়ে ১৫ এপ্রিল ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, চীন গোপনে ইরানকে একটি ‘গুপ্তচর স্যাটেলাইট’ সরবরাহ করেছে, যা তাদের মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো পর্যবেক্ষণ ও নিশানা করার সক্ষমতা দিচ্ছে। তবে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট’ বলে নাকচ করে দেয়।
আবার সিএনএন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীন থেকে ইরানে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর তথ্য রয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ওই চালান এরইমধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা লিখলেও সিএনএন বলছে, চীন আগামী সপ্তাহে ওই ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও চীন
ফেব্রুয়ারির শেষ দিন ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিয়ান শুরুর পর থেকে যুদ্ধ নিয়ে চীনের প্রকাশ্য বক্তব্য কিছুটা সংযত। এর আংশিক কারণ হল আরব দেশগুলোর সঙ্গে চীনের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, যারা ইরানি হামলার শিকার হয়েছে।
আবার আসন্ন ট্রাম্প-শি সম্মেলনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাও বেইজিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য।
সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব আমেরিকান অ্যান্ড প্যাসিফিক স্টাডিজের পরিচালক হুয়াং জিং চীনের একটি সংবাদমাধ্যমে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং পুরো বিশ্বের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে।”
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীনের এই প্রভাব রাশিয়া কীভাবে দেখছে, তারও একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় বেইজিংয়ে ল্যাভরভের বক্তব্যে।
চীনা সংবাদমাধ্যম সিজিটিএন বলছে, ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠকে ল্যাভরভ বলেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তীব্র অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ‘একতরফা আধিপত্যবাদের’ ক্ষতি আরও প্রকট হয়েছে এবং মানবজাতির শান্তি ও উন্নয়নের পথ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
“এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া চীনের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখতে, ব্যবহারিক সহযোগিতা গভীর করতে এবং পারস্পরিক স্বার্থ ও জয়ী হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে ইচ্ছুক।”
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এবং কিছু দেশ রাশিয়া ও চীনকে দমানোর জন্য ‘ছোট বলয়’ তৈরির চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন ল্যাভরভ।
জবাবে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরো সদস্য ওয়াং ই বলেন, “জটিল ও পরিবর্তনশীল পরিবেশের মধ্যেও দুই রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত তদারকি এবং কৌশলগত নির্দেশনায় চীন-রাশিয়া সম্পর্ক অটুট রয়েছে। দুই দেশের উচিত রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যগুলো বাস্তবায়ন করা এবং দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়া।”
ওয়াং বলেন, “জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় কাঠামোর অধীনে উভয় পক্ষের সহযোগিতা বৃদ্ধি করা উচিত। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) প্রতিষ্ঠার ২৫তম বার্ষিকীকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে রাশিয়া ও চীনের উচিত তিয়ানজিন শীর্ষ সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা। এছাড়া এ বছর কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠেয় সম্মেলন সফল এবং ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের ধারা বজায় রাখা। একইসঙ্গে 'গ্লোবাল সাউথ'-এর বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে কাজ করবে।”
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে ‘কৌশলগত সমন্বয়’ বজায় রাখা, বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক নৈতিকতা চর্চায় হাত মেলানো এবং বিশ্বের মেরুকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।