Published : 25 Apr 2026, 01:39 AM
মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পোপের বিরোধের জেরে ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেই বিতর্কের বিষয়টি হলো— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাঁধানো এই সংঘাতকে কি ‘ন্যায়যুদ্ধ’ বলা যাবে?
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও পোপ লিওর মধ্যে কয়েক দিন ধরে যে কথার লড়াই চলছে, সেগুলো নতুন করে সামনে না এনেও বলা যায়, ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুজনের অবস্থান মোটামুটি বিপরীত মেরুতে।
ভ্যান্সের ‘পরামর্শ’ নিয়ে সমালোচনা
গত সপ্তাহে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, “পোপ যে শান্তির পক্ষে কথা বলেন, সেটা আমার ভালো লাগে। এটা অবশ্য তার দায়িত্বেরই একটা অংশ।”
পোপকে আক্রমণ না করে ভ্যান্স বলেন, যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে পোপ যেসব কথাবার্তা বলেন, সেগুলো তিনি পছন্দ করেন। কারণ এর মধ্যদিয়ে যুদ্ধ নিয়ে ‘অন্তত একটি আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে’।
এই আলোচনা অবশ্য সামনে এসেছে ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর। কারণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাঝপথেই সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়ে বসে। এছাড়া হামলা শুরুর আগে যুদ্ধের পক্ষে কোনো যুক্তি কিংবা জনমত গড়ে ওঠেনি।

ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী ভ্যান্স তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে একটি বই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। গেল বছর পোপ লিওর সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন এবং পোপকে নিজের পছন্দের ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন।
তবে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অনুষ্ঠানে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আপনি কীভাবে বলতে পারেন যে, যাদের হাতে তলোয়ার থাকে, ঈশ্বর তাদের পক্ষে থাকেন না? ফ্রান্সকে নাৎসিদের হাত থেকে মুক্ত করা আমেরিকানদের পক্ষে কি ঈশ্বর ছিলেন না? হলোকাস্ট শিবিরগুলো মুক্ত করা আমেরিকানদের পক্ষে কি ঈশ্বর ছিলেন না?”
সেখানে একজন দর্শক কিছু একটা বলতে চাইছিলেন। কিন্তু সেটা কানে না নিয়ে ভ্যান্স আরও বলেন, “যখন পোপ বলেন যে তলোয়ারধারীর পক্ষে ঈশ্বর থাকেন না, তখন মনে রাখতে হবে যে, ‘ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বের’ হাজারো বছরের ঐতিহ্য রয়েছে।
“কোনো সংঘাত ন্যায়সঙ্গত কিনা, সেই বিতর্ক আমরা অবশ্যই করতে পারি। কিন্তু আমি যেমন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জননীতি নিয়ে কথা বলার সময় সতর্ক থাকার চেষ্টা করি, তেমনি ধর্মতত্ত্বের বিষয়ে কথা বলার সময় পোপেরও সতর্ক থাকা জরুরি।”
এই বক্তব্যের শেষ অংশ, অর্থাৎ পোপকে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়ায় অনেকে ভ্যান্সের সমালোচনা করেছেন।
তবে পুরো প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে মন্তব্যটি ভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে বলে সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, ‘ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বটি’ হাজার বছরের পথপরিক্রমায় নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।

এই তত্ত্বের সূত্রপাত চতুর্থ শতকের ধর্মতাত্ত্বিক সেন্ট অগাস্টিনের চিন্তাধারা থেকে। ফলে অগাস্টিনীয় ধর্মসংঘের উত্তরসূরি হিসেবে এ বিষয়ে পোপের বোঝাপড়ায় ঘাটতি থাকার কথা নয়।
যদিও অনেক রিপাবলিকান নেতাই ভ্যান্সের সুরে কথা বলছেন।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন মনে করেন, ইরান যুদ্ধকে একটি ‘ন্যায়যুদ্ধ’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তিনি বলেন, “খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয়। ‘ন্যায়যুদ্ধ মতবাদ‘ বলে একটি ধারণা রয়েছে। পৃথিবীতে প্রত্যেক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে।
“প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে আমার কাছে মনে হয়েছে, তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং ঝুঁকির বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।”
যুদ্ধটি ন্যায়সঙ্গত কিনা, সেই প্রশ্নে অবশ্য ভিন্নমত দিয়েছে ‘ইউনাইটেড স্টেটস কনফারেন্স অব ক্যাথলিক বিশপ’ (ইউএসসিসিবি)। সংগঠনটি বুধবার পোপ লিওর মন্তব্যের বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে।
বিশপদের বিবৃতিতে বলা হয়, “হাজার বছরের বেশি সময় ধরে ক্যাথলিক চার্চ ‘ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব’ শিক্ষা দিয়ে আসছে। যুদ্ধ সম্পর্কে পোপের কাছ থেকে যে মন্তব্য এসেছে, তা তিনি সচেতনভাবেই করেছেন।”
ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ‘প্রতিরক্ষা’ ধারণা থেকে দূরে সরাতে চাইছে। পেন্টাগনের দ্বিতীয় নাম হিসেবে আবার ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ যুক্ত করা হয়েছে।
কারণ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং নিজেকে কখনো কখনো ‘যুদ্ধমন্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধ জিতত, সেই সময়কার স্মৃতি ফেরাতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ফলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষার’ চেয়ে ‘আক্রমণাত্মক’ দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি ফুটে উঠেছে।

ভারসাম্যের শর্ত
সিএনএনের ভ্যাটিকান সংবাদদাতা ক্রিস্টোফার ল্যাম্ব লিখেছেন, প্রথম আমেরিকান পোপ লিও যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে সরব হয়ে উঠছেন।
ভ্যাটিকান বলেছে, ‘ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্বের’ একটি প্রধান নীতি হলো ‘সমানুপাতিকতা’, অর্থাৎ সামরিক অভিযান যে ধ্বংস ডেকে আনে, তা যেন কল্যাণের চেয়ে বেশি না হয়।
সিএনএনকে শিকাগোর আর্চবিশপ কার্ডিনাল ব্লেইস কুপিচ বলেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সঙ্গে ইরান যুদ্ধকে মেলানো কিছুটা বিস্ময়কর।”
তার ভাষায়, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইচ্ছাতেই শুরু হয়েছে।
ইরান যুদ্ধকে ‘ন্যায়যুদ্ধ’ যুদ্ধ বলা যায় কিনা, সেই প্রশ্নে কুপিচ সরাসরি জবাব দেন, “না, এটি ন্যায়সঙ্গত নয়।”

চার শর্তের পরীক্ষা
ইউএসসিসিবির বিবৃতিতে ক্যাথলিক চার্চের ধর্মশিক্ষা গ্রন্থকে উদ্ধৃত করা হয়, যেখানে ‘ন্যায়যুদ্ধের’ ক্ষেত্রে চারটি শর্তের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো—
>> বিরোধীপক্ষ যে হুমকি তৈরি করেছে, তার প্রভাব ভুক্তভোগী গোষ্ঠী বা জাতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর হতে হবে;
>> আগ্রাসন বন্ধের সব বিকল্প অকার্যকর প্রমাণিত হতে হবে;
>> যুদ্ধে সাফল্যের বাস্তব সম্ভাবনা থাকতে হবে;
>> অস্ত্রের ব্যবহার এমন পরিণতি ডেকে আনবে না, যা বিরোধীপক্ষের আগ্রাসনের চেয়েও ভয়াবহ।
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের যুগে ‘ন্যায়যুদ্ধ’
এসব শর্তের প্রসঙ্গ টেনে কুপিচ বলেন, আধুনিক অস্ত্র সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং ভয়াবহভাবে বেসামরিক নাগরিকদের ঝুঁকির মুখে ফেলে।
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে পারেনি।
তিনি বলেন, “এই যুদ্ধ নিয়ে আমরা অসংখ্য মন্তব্য শুনছি, যেখানে স্পষ্ট কোনো লক্ষ্য দৃশ্যমান নয়। এখানে একেক সময় একেকটি বিষয় সামনে আনা হচ্ছে।”
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বহুল উচ্চারিত কারণ হলো, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা থেকে বিরত রাখা।
অন্যদিকে ইরান দাবি করে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং এর লক্ষ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন।