Published : 06 Jul 2026, 11:33 PM
প্রশান্ত মহাসাগরে সাবমেরিন থেকে একটি বিরল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া।
দেশ দুটির দাবি, বেইজিংয়ের এই সামরিক তৎপরতা ওই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। চীনের নৌবাহিনীর মুখপাত্র সিনিয়র ক্যাপ্টেন ওয়াং জুয়েমেং এক বিবৃতিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছেন।
তিনি জানান, পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) নৌবাহিনীর একটি সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের নির্ধারিত জলসীমা লক্ষ্য করে একটি ডামি ওয়ারহেডবাহী কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট জলসীমার ভেতরে আঘাত হেনেছে।
ওয়াং আরও বলেন, “এই পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণটি ছিল চীনের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির একটি রুটিন অংশ।”
তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে এই পরীক্ষার বিষয়ে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। এই উৎক্ষেপণ আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি মেনেই করা হয়েছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে এটি করা হয়নি।
তবে বেইজিং সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি যে কোন মডেলের ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়েছে।
চীনা নৌবাহিনী প্রধানত সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য দুই ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করে- জেএল-২ এবং জেএল-৩।
ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা এতটাই বেশি যে, এটি দক্ষিণ চীন সাগরসহ চীনের উপকূলীয় জলসীমা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।
চীনের প্রধান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাবমেরিন হল টাইপ ০৯৪, যা ‘জিন ক্লাস’ নামেও পরিচিত। বেইজিং বর্তমানে এ ধরনের চারটি সাবমেরিন পরিচালনা করছে। চীন সাধারণত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার খবর প্রকাশ করে না।
তবে থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্ট অনুযায়ী, জেএল-৩ প্রথম ২০১৮ সালে এবং এর এক বছর পর আরও একবার পরীক্ষা করা হয়েছিল।
প্রতিবেশীদের ক্ষোভ ও ঐতিহাসিক চুক্তি:
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স জানান, চীন সোমবার দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় পারমাণবিক মুক্ত অঞ্চলে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করেছে।
১৯৮৬ সালের রারোটোঙ্গা চুক্তির মাধ্যমে এই মুক্ত অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যার দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রটোকলে ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষর করেছিল চীন।
এই চুক্তির দ্বিতীয় প্রটোকল অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এই অঞ্চলের অন্য কোনো দেশ বা তাদের ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিতে পারবে না। আর তৃতীয় প্রটোকলে এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পিটার্স বলেন, “চীন আজ আমাদের দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। নিউজিল্যান্ড এটিকে একটি অনভিপ্রেত এবং উদ্বেগজনক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করছে।”
তিনি আরও বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মতো আমাদেরও কোনও আগ্রহ নেই যে চীন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে ব্যবহার করুক।
তিনি উল্লেখ করেন, এই পরীক্ষা ২০২৪ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যখন চীনের সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছিল।
আঞ্চলিক দেশগুলোর এই ধরনের পরীক্ষাকে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হতে দেওয়া ঠিক হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন। ওদিকে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এই পরীক্ষাকে “আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “চীনের দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেই এই পরীক্ষাকে দেখতে হবে, যেখানে স্বচ্ছতা ও আঞ্চলিক প্রত্যাশা অনুযায়ী আশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে।”
এছাড়া জাপান সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা নিয়ে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করা হয়েছে।
অবশ্য পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা একটি নিয়মিত বিষয়।
উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন নৌবাহিনী গত সেপ্টেম্বর মাসে ফ্লোরিডা উপকূলে তাদের ট্রাইডেন্ট সাবমেরিন থেকে চারবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে।
এছাড়া ভারত গত ডিসেম্বরে এবং রাশিয়া গত অক্টোবরে সাবমেরিন থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
চীন বর্তমানে তাদের পারমাণবিক শক্তির সামগ্রিক বৃদ্ধির অংশ হিসেবে পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন বহর তৈরি করছে।
এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের হাইনান দ্বীপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার কাছে পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে আইসিবিএম পরীক্ষা করেছিল।
এটি ছিল চুয়াল্লিশ বছরের মধ্যে উন্মুক্ত মহাসাগরে চীনের প্রথম আইসিবিএম পরীক্ষা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন সাধারণত তাদের নিজেদের সীমান্তের ভেতরেই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রশিক্ষণ ঘাঁটি থেকে একের পর এক বেশ কয়েকটি আইসিবিএম উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, যা সাইলো-ভিত্তিক একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত উৎক্ষেপণের সক্ষমতা নির্দেশ করে।
চীনের সামরিক শক্তির ওপর মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিং এ ধরনের পরীক্ষাকে “মাঝারি থেকে উচ্চ তীব্রতার পারমাণবিক প্রতিরোধ অভিযানের একটি বিকল্প” হিসেবে বিবেচনা করে।