Published : 07 Jul 2026, 12:02 AM
চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়গুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনকারীদের তালিকা গত তিন বছর ধরে হালনাগাদ হয়নি। পাহাড় থেকে বসতি সরাতে জেলা প্রশাসন যে অভিযান চালাত, সেটিও বন্ধ।
তবে পাহাড় দখল ও কাটা ঠেকাতে চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত ৪৯টি অভিযান চালিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু অবৈধ বসতি উচ্ছেদে তাদের একতিয়ার না থাকায় বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে মানুষকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে নগরীর পাহাড়গুলো থেকে অবৈধ বসতি সরানো এবং পাহাড় রক্ষা কোনটাই সম্ভব না। পাহাড় রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে শুধু বর্ষা এলেই কিছু পদক্ষেপ নিয়ে দায় সারছে প্রশাসন।
বন্দর নগরীতে রোববার সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। দিনভর বৃষ্টির পর রাতে তীব্রতা বাড়ে। সোমবারও দিনভর অতি ভারী বর্ষণ হয় নগরীতে।
সোমবার রাত ৯টা পর্যন্ত নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া কেন্দ্রে আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৪৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার এবং আমবাগান আবহাওয়া অফিসে একই সময়ে ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এর মধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর রোববার বিকালে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ধসের সতর্কতা জারি করে। সোমবার বিকালেও একই সতর্কতা জারি রাখা হয়।
এমন সতর্কতায় সোমবার নগরীর বেশকিছু পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর। খোলা হয় আশ্রয় কেন্দ্রও; কিন্তু সেখানে লোক যায়নি বললেই চলে।
২০২৩ সালে জেলা প্রশাসনের করা তালিকা অনুসারে, নগরীর অন্তত ২৬টি পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৫৮টি। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগের মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে বসবাস ছিল ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবারের। ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩৮৩টি।
নগরীর আকবর শাহ থানার ফয়েজ লেক সংলগ্ন ১ নম্বর ঝিল, ২ নম্বর ঝিল, ৩ নম্বর ঝিল এলাকা ও শান্তিনগর এলাকা, বায়েজিদ লিংক রোড এবং সলিমপুরের পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকা, ফিরোজ শাহ কলোনি, লালখান বাজার, টাঙ্কির পাহাড়, মতিঝর্ণা, বাটালি হিল ও পোড়া কলোনির পাহাড়, ষোলশহর স্টেশন সংলগ্ন পাহাড়, বিজয়নগর, আকবর শাহ থানার বেলতলি ঘোনা, চান্দগাঁ থানার আমিন জুট মিলস পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, বার্মা কলোনি এলাকায় পাহাড়েও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি আছে।
২০০৭ সালের ১১ জুন ভারি বর্ষণে নগরী ও আশেপাশের এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। এরপর চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় গঠিত হয়েছিল ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’। সবশেষ গত বছরের ২৬ মে এই কমিটির ৩১তম সভা হয়। কিন্তু সেখানেও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস স্থাপনকারীদের তালিকা হালনাগাদ করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনার হালনাগাদ তথ্য এখন পর্যন্ত নেই। আগামী ১৩ জুলাই কমিটির পরবর্তী সভা হবে। সেখানে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করা হবে।”

পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, “এখন অতি ভারী বর্ষণ হচ্ছে। পাহাড়ে যারাই থাকুক তারা বাংলাদেশের নাগরিক। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান আমাদের প্রধান দায়িত্ব। সেই কার্যক্রম চলমান আছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি কেটে গলে তারপর আবার পাহাড় সুরক্ষার লক্ষ্যে কাজ শুরু করা যাবে।”
অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের সহকারি পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, “কোথাও পাহাড় কাটার সংবাদ পেলে, এমনকি রাতেও, আমরা সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালাই। চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত পাহাড় কাটা বন্ধে এরকম ৪৯টি অভিযান চালানো হয়েছে।
“এসব অভিযানে মোট ১১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলাও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।”
তবে চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় দাবি করে পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০০৭ সালের ভয়াবহ সেই ঘটনার পর গঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি ৩৬টি সুপারিশ নির্ধারণ করেছিল। এসবের মধ্যে কতটি বাস্তবায়ন হয়েছে তা আমরা জানি না। বছরে এক-দুইটি সভা করেই তারা দায়িত্ব শেষ করে।
“কিন্তু পাহাড়ে যে হাজার হাজার মানুষের বসবাস, সেখানে বিদ্যুৎ, পানিসহ বিভিন্ন সেবার সরবরাহ আছে। সেগুলো কীভাবে থাকে? প্রশাসন মূলত এই সমস্যাকে সিজনাল (মৌসুমি) বলে ধরে নিয়েছে। তাই বর্ষা এলে মাইকিং আর আশ্রয়কেন্দ্র খুলেই দায় সারে।”
গত তিন বছরে পাহাড়গুলোতে অবৈধ বসতি অনেক বেড়েছে দাবি করে অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, “কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উদ্বাস্তু বহু মানুষ গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে এসেছে। তারা এসব পাহাড়ের ঢালেই আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।

“এসব অসহায় মানুষকে সামনে রেখে যেসব ভূমিদস্যু পাহাড় কেটে ধ্বংস ও দখল করে, তাদের এত বছরেও চিহ্নিত করা হয়নি। দল বদল হয় কিন্তু দখল থামে না।”
চট্টগ্রাম পাহাড় রক্ষায় দুই দশক ধরে আন্দোলন চালান পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েস এর সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, “যে হারে গত কয়েক দশক ধরে পাহাড় কাটা হয়েছে, তাতে নগরীতে আর খুব বেশি পাহাড় অবশিষ্ট নেই।
“নিম্নবিত্ত ভূমিহীন মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাহাড় দখলের এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও আছে। কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু বর্ষা এলে কিছু লোক দেখানো কাজ করা এখন রুটিনে পরিণত হয়েছে।”
চট্টগ্রামে ২৬ পাহাড়ে ৬৫৫৮ অবৈধ স্থাপনা, মামলায় আটকে উচ্ছেদ