খালের বাঁধ সরেছে, সুফল মিলবে তো?
চলতি বছর বৃষ্টিপাত হচ্ছে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের সুফল নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা।
লঘুচাপের প্রভাবে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে রোববার প্রায় ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও খালে থাকা বাঁধ সরিয়ে নেওয়ায় কোথাও জলাবদ্ধতা হয়নি।
তবে চলতি বছর বৃষ্টিপাত হচ্ছে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের সুফল নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দাবি, যেসব খালে কাজ শেষ হয়েছে, সেসব এলাকায় আর জলাবদ্ধতা হচ্ছে না। পুরো কাজ শেষ হলে প্রকল্পের সুফল মিলবে।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ও মে মাসের শুরুতে বৈশাখের বৃষ্টিতে কয়েক দফায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
সেসময় নগরীর চকবাজার, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট মোড়, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, তিন পোলের মাথা, হেমসেন লেন, জামালখান রোড, রহমতগঞ্জ, দেওয়ানজি পুকুরপাড়, জে এম সেন হল লাগোয়া গলি এবং সিরাজুদ্দৌলা রোডের কাঁচাবাজার থেকে মাছুয়া ঝর্না পর্যন্ত অংশে কয়েক দফায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
তখন এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার পর হিজরা খাল ও জামালখান খালে সংস্কার কাজের জন্য দেওয়া প্রায় ৩৫টি বাঁধ কেটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সিডিএ।
এরপর একে একে বাঁধগুলো কেটে দেওয়া হয়। মে মাসের মধ্যেই বাঁধ অপসারণের কাজ শেষ হয়।
তারপর ১২ জুন বেলা ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নগরীতে ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, পাঁচলাইশের কয়েকটি স্থান ও বাকলিয়ার ইছাইক্যার পুল এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা হয়; অন্য কোথাও জলাবদ্ধতা হয়নি।
এদিকে রোববার ভোর থেকে বন্দর নগরীতে বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে থেমে থেমে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, “সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ সারারাত এবং আগামীকালও বৃষ্টিপাত হবার সম্ভাবনা আছে।”
নগরীর হিজরা খাল ও জামালখান খালের সবগুলো বাঁধ মে মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ায় রোববার দিনভর বৃষ্টি হলেও জলবাদ্ধতা হয়নি বলে দাবি করেন জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক সিডিএ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহম্মদ মঈনুদ্দিন।
জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজকে কোথাও জলাবদ্ধতা না হলেও সিডিএ এবং প্রকল্পের পূর্ত কাজ পরিচালনাকারী সেনাবাহিনীর একাধিক টিম মাঠে ছিল। হিজরা খাল ও জামালখান খালের বাঁধগুলো ইতিমধ্যে কেটে দেওয়া হয়েছে।
“হিজরা খালের কাজ এখন পর্যন্ত ৬৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। অন্য যেসব খালের কাজ শেষ হয়েছে সেই এলাকাগুলোতে এখন আর জলাবদ্ধতা হচ্ছে না।”
রোববার বিকেলে নগরীর জামালখান, প্রবর্তক মোড়, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা ও কাতালগঞ্জ ঘুরে কোথাও খালের ভিতর বাঁধ দেখা যায়নি।
তবে হিজরা খাল ও জামালখান খালের কয়েকটি অংশে সংস্কার কাজে ব্যবহৃত যানবাহন চলাচলের জন্য মাটি ভরাট করে তৈরি রাস্তাগুলো দেখা গেছে। তাতে খালের খোলা থাকা অপ্রশস্ত অংশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
নগরীর জামালখান এলাকার প্রচ্ছদ গলির বাসিন্দা শৈবাল পারিয়াল বলেন, “এপ্রিলের শেষে কয়েকদিনের জলাবদ্ধতার পর থেকে টানা কাজ করে জামালখান খালের বাঁধগুলো কাটা হয়েছে। কিন্তু জলাবদ্ধতার আশঙ্কা এখনো আছে। কারণ হল আবর্জনা।
“খালের ভিতর যে রাস্তা করা হয়েছিল, অবশিষ্ট সংস্কার কাজের জন্য তা এখনো আছে। ফলে পানি চলাচল করছে কম চওড়া একটা অংশ দিয়ে। তাই যদি ঠিকমত আবর্জনা পরিষ্কার করা না হয়, ভারি বৃষ্টিতে সব গিয়ে খালে পড়বে। যা পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত করবে। তখন আবার জলাবদ্ধতা হতে পারে।”
ওয়ার্ডভিত্তিক জলাবদ্ধতার কারণ শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে জানিয়ে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খাল ও ছড়াগুলো নগরবাসীর সম্পদ। এসব জলাধার দখল ও দূষণের কারণে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি জটিল হয়। যারা খাল-ছড়া দখল করে রেখেছেন, তাদের স্বেচ্ছায় অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
“অনেক স্থানে খালের ওপর স্থাপিত স্ল্যাব ও অবকাঠামো পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে পুরো খাল ব্যবস্থাকে পরিষ্কার ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম এর সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এবার জুন মাসে দেশে গড় প্রত্যাশিত বৃষ্টির চেয়ে ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।
“এবছর পুরো বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি তুলনামূলক কমই হতে পারে। তাই এবার হয়ত জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে না। প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে কিছু সুফল অবশ্যই পাব।
“কিন্তু সমস্যার সার্বিক সমাধানে মনযোগ দিতে হবে। এজন্য প্রকল্প শেষে যে সংস্থা খালগুলো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে তাদের সক্ষমতা, জনবল, অর্থনৈতিক ও যান্ত্রিক দক্ষতা বাড়াতে হবে।”
এবার এপ্রিল ও মে মাসে জলাবদ্ধতার উদাহরণ টেনে দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “একটা মেনটেইনেন্স ম্যানুয়াল থাকতে হবে এবং বর্ষার কত আগে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ করতে হবে সেটা নির্ধারণ করা জরুরি।”
মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ৩৬টি খাল নিয়ে চলমান প্রকল্প শেষে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য একটি এবং অন্য ৪০টি খাল খননে আরেকটি প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলো হলে জলাবদ্ধতা থেকে ‘পুরোপুরি মুক্তি’ মিলবে।
রোববার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জলাবদ্ধতা প্রকল্প নিয়ে আলাপ হয়েছে জানিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ব্যয়ে সাশ্রয়ী হতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলেছেন। আর খাল-নালা-ড্রেনে পলিথিন ও আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। চট্টগ্রামে ফিরেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেব।”
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৭ সালের ৯ অগাস্ট একনেকে ‘মেগা প্রকল্প’ অনুমোদন হয়। পরের বছর এপ্রিলে কাজ শুরু হয়।
শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। প্রকল্প শেষের সময় ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন।
পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সংশোধন শেষে প্রকল্প ব্যয় আরো ৩ হাজার ১০ কোটি টাকা বেড়ে হয় মোট ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। মেয়াদ ঠিক করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
তবে জলাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি স্থানে চলমান সংস্কার কাজ বন্ধ করায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার নতুন লক্ষ্যের কথা জানিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
