Published : 02 Jun 2026, 08:38 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এবং লেবাননে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করায় পশ্চিম এশিয়ার রণক্ষেত্রে নজর এখন আরেকটি কৌশলগত সমুদ্রপথের দিকে ঘুরে যাচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই অঞ্চলের চলমান সংকটে পরবর্তী বড় উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোতে একটি খবর চাউর হয়েছে।
তাতে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযানের জেরে ইরান ও এর আঞ্চলিক মিত্ররা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালিসহ ‘অন্যান্য ফ্রন্ট সক্রিয় করার’ বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সোমবার লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ইরান। এর পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে বাব আল-মান্দেব নিয়ে ওই খবর সামনে এল।
ইরানের প্রেস টিভির খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার ইরানের সামরিক বাহিনীর কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানিও এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, গাজা এবং লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ না-হলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও হরমুজের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকা ইসরায়েল যদি লেবানন এবং গাজায় হামলা বন্ধ না করে, তবে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ উভয় যুদ্ধক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেবে। বাব আল-মান্দেব প্রণালিও হরমুজের মতোই নিয়ন্ত্রণ করা হবে।”
ইরানের কর্মকর্তারা অবশ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও দেননি। তবে ইরানের গণমাধ্যমের খবরে এই প্রণালি নিয়ে যে হুমকির আভাস মিলছে, সেটিই বিশ্ব বাজারকে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কারণ, এর আগেই হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজার এমনিতেই অস্থিতিশীল হয়ে রয়েছে, যে পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করা হয়।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী:
হরমুজ প্রণালির বাইরেও এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনীকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, বিনিয়োগকারীদের এমন আশঙ্কায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে।
তেহরানের আগের কিছু সতর্কবার্তার কারণে এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত মাসে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছিল, নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে তা ‘এই অঞ্চলের বাইরেও’ ছড়িয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, ইরানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা ‘নতুন যুদ্ধক্ষেত্র’ এবং ‘নতুন হাতিয়ার’ ব্যবহার করবেন।
একনজরে বাব আল-মানদাব প্রণালি:
অবস্থান: ইয়েমেন এবং আফ্রিকার শিং (হর্ন অব আফ্রিকা)-এর মধ্যবর্তী অঞ্চল।
সংযোগ: লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
গুরুত্ব: সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার এবং বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত সমুদ্রপথ।
প্রস্থ: সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে এটি প্রায় ২৯ কিলোমিটার চওড়া।
বাণিজ্য: বিশ্বের প্রায় ১৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই পথেই সম্পন্ন হয়।
পণ্য: জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং কনটেইনার শিপিংয়ের প্রধান রুট।
পূর্ব ইতিহাস: ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় এই পথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
বিকল্প রুট: বহু বাণিজ্যিক জাহাজকে তখন আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল।
ক্ষতি: এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে শত শত কোটি ডলারের বাড়তি খরচ হয়েছিল।
বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক জলপথ। এর এক দিকে রয়েছে ইয়েমেন। অন্য দিকে রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের জিবুতি এবং ইরিত্রিয়া। দিনে প্রায় ৮৮ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল পরিবহণ হয় বাব আল-মান্দেবের করিডর দিয়ে। পাশাপাশি, ওই পথে চলাচল করে বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০-১২ শতাংশ পণ্য।
২০২৩ সালের শেষের দিকে, গাজা যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতিরা এই প্রণালি এবং এর আশেপাশের জলসীমায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলা চালিয়েছিল।
হুতিদের সেই হামলার কারণে অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এতে যাত্রাপথ হাজার হাজার কিলোমিটার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ে।
সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, সেই অচলাবস্থার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল এবং নৌ-পরিবহন ও বিমা খরচ আকাশচুম্বী হয়েছিল।
চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও বাব আল-মান্দেব প্রণালি এখন পর্যন্ত অনেকটাই উন্মুক্ত ও সচল রয়েছে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি রুট এবং সুয়েজ খালে প্রবেশের একমাত্র পথ ধরে রেখেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের প্রথাগত সামরিক ক্ষমতার মধ্যে নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ এবং প্রধান বাণিজ্য পথগুলোকে বিপর্যস্ত করার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর, তেহরান হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে অধিকাংশ বাণিজ্যিক কার্যক্রম কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, চরম উত্তেজনার মুহূর্তে এই কৌশলগত জলপথগুলোকে তারা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না।
এখন হরমুজের মতো যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও একইরকম অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে পশ্চিম এশিয়ার বাইরের দেশগুলোর ওপরও তীব্র অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং ইতিমধ্যে ভঙ্গুর হয়ে পড়া বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বড় সংকটে পড়বে।
লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল যখন সামরিক অভিযান বাড়াচ্ছে এবং যুদ্ধ অবসানের পরোক্ষ আলোচনা যখন থমকে, ঠিক তখনই এই তথ্য সামনে এল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর ওপর চাপ আরও বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন, অন্যদিকে তেহরানের জেদ, যেকোনো বৃহত্তর শান্তি চুক্তির আগে লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান বন্ধ হতে হবে।
আপাতত বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনও সুনির্দিষ্ট লক্ষণ নেই।
তবে কেবল সেটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাই স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরান, ইসরায়েল এবং লেবাননকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি যুদ্ধ কত দ্রুত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি ইতিমধ্যে অবরুদ্ধ থাকায়, বাব আল-মান্দেবর ওপর যে কোনো নতুন হুমকি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এটি এমন এক সংঘাত, যা সামাল দিতে বিশ্ব কূটনীতিকদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সূত্র: গালফ নিউজ