মহাসড়কের নতুন ‘বিপদ’ থেমে থাকা যানবাহন
বাংলাদেশে বিকল গাড়ির পেছনে কেবল একটি গাছের ডাল ঝুলিয়ে দিয়েই ‘বিকল হওয়ার’ বার্তা দেওয়া হয়, দ্রুতগতির সড়কে রাতের বেলা তা বোঝা যায় না।
প্রশস্ত একমুখী মহাসড়ক মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা কমিয়ে আনতে পারলেও রাস্তার পাশে থেমে থাকা গাড়ির পেছনে চলন্ত গাড়ির ধাক্কায় হতাহতের ঘটনা বেড়েই চলেছে।
ঈদের ছুটি শেষে সোমবার ভোরে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক্সপ্রেসওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের নিচে ঢুকে পড়ে একটি প্রাইভেট কারের পাঁচ আরোহীর প্রাণ যায়।
তার আগে ৩১ মে সিলেটের ওসমানীনগরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসের পেছনে আরেকটি বাসের ধাক্কায় দুই কর্মীর মৃত্যু হয়।
তার আগে গত ৫ মে গাইবান্ধায় থেমে থাকা সিমেন্টবাহী ট্রাকের পেছনে বাসের ধাক্কায় বাসচালকের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আহত হন আরও চার যাত্রী।
পুলিশ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে থেমে থাকা যানবাহনের পেছন থেকে ধাক্কা খাওয়ার (রেয়ার এন্ড কলিসন) ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। দেশের মহাসড়কগুলো প্রশস্ত ও একমুখী হওয়ার পর এই নতুন বিপদ দেখা দিয়েছে।
আগে মহাসড়কগুলো যখন দ্বিমুখী ছিল, তখন যানবাহনের গতি ছিল কম, তারপরও যানবাহনের ‘মুখোমুখি সংঘর্ষে’র ঘটনা প্রায়ই খবরের শিরোনাম হত।
এখন মহাসড়কগুলো উন্নত হওয়ায় যানবাহনের গতি বেড়েছে। ফলে চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ সামনে থেমে থাকা যানবাহন দেখে গতি সামলাতে পারছেন না চালকেরা, ঘটছে দুর্ঘটনা।
পুলিশ বলছে, মূলত বিকল হওয়ার কারণে যানবাহনগুলো এক্সপ্রেসওয়ের মত উচ্চ গতির রাস্তায় দাঁড়াতে বাধ্য হয়। তবে উন্নত দেশগুলোতে এরকম উচ্চগতির সড়কে যানবাহন বিকল হলে হ্যাজার্ড লাইট জ্বালানোর বাধ্যবাধকতার পাশপাশি দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির কয়েক মিটার আগে বিকন বাতি বা প্রতিফলক (রিফ্লেক্টর) কোন স্থাপন করে অন্য যানবাহনগুলোকে সতর্ক করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশে বিকল গাড়ির পেছনে কেবল একটি গাছের ডাল ঝুলিয়ে দিয়েই ‘বিকল হওয়ার’ বার্তা দেওয়া হয়। ফলে দ্রুতগতির সড়কে রাতের বেলা বোঝা যায় না যে সামনের গাড়িটি বিকল।
দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে আসা ও যাওয়ার লেইন এখন বিভাজক দিয়ে ভাগ করা। ঢাকা-ভাঙা (ফরিদপুর) মহাসড়কটি এক্সপ্রেসওয়ে করা হয়েছে। ঢাকা থেকে রংপুর মহাসড়কটি পুরোটাই বিভাজক দিয়ে ভাগ করা, মোটামুটি চন্দ্রা থেকে রংপুর পর্যন্ত এ সড়ক এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকা চট্টগ্রাাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কও বিভাজক দিয়ে ভাগ করা। মহাসড়কগুলো একমুখী হওয়ায় যানবাহনগুলো বেশি গতিতে ছুটতে পারছে।
দেশে দুর্ঘটনার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে বেসরকারি সংস্থা রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন। এর নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫টি এরকম রেয়ার এন্ড কলিসনের ঘটনা ঘটছে।
“সড়কে বিকল বাস-ট্রাক দাঁড়িয়ে থাাকছে, পেছন থেকে আরেকটা বাহন এসে ধাক্কা মারছে। বিষয়টা নিয়ে কেউ কিছুই বলছে না।”
এসব ঘটনায় পুলিশের দায় আছে মন্তব্য করে সাইদুর বলেন, সোমবার ভাঙা এক্সপ্রেসওয়েতে যে সিলিন্ডারভর্তি ট্রাকটির পেছনে প্রাইভেট কার ধাক্কা খেল, পাঁচজনের প্রাণ গেল; সেই ট্রাকটি বিকল হয়ে ছিল।
“প্রতিদিন এরকম শত শত যানবাহন হাইওয়েতে বিকল হচ্ছে, কারণ পুলিশ আনফিট যানবাহন চলতে দিচ্ছে। দুর্ঘটনার পর বের হয় যে ওই যানবাহনের ফিটনেস ছিল না, চালকের লাইসেন্স ছিল না।”
তবে শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি মিজানুর রহমান বলছেন, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহন পার্ক করে রাখার সেইফ জোন আছে। সেখানে মার্কিং করা আছে।
“কোনো যানবাহন বিকল হওয়ার সাথে সাথে আমাদের খবর দিলে বা আমাদের টহল দলগুলো খবর পেলে ওই গাড়িগুলোকে টো করে সেইফ জোনে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু আমাদের খবর পেতে বা যেতে যে সময়টা প্রয়োজন সেই সময়ের মধ্যেও কখনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়।”
হঠাৎ রাস্তায় বিকল হয়ে গেলে যানবাহনগুলোর ক্ষেত্রে কী নিয়ম মানতে হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, “নিয়ম হচ্ছে বিকল যানবাহন নিজেকে দৃশ্যমান রাখতে লাইট জ্বালিয়ে রাখবে, দুই পাশের ইন্ডিকেটর (হ্যাজার্ড লাইট) একসাথে জ্বালাবে যাতে দূর থেকে অন্য যানবাহন তাকে দেখতে পায়।”
তবে পেশাদার চালকেরা বলছেন, বাংলাদেশের সড়কের ওপর যানবাহন বিকল হলে একটা গাছের ভাঙা ডাল ঝুলিয়ে রাখাটাই প্রথা।
রাতের বেলা কেউ কেউ পার্কিং লাইট জ্বালিয়ে দেয়। এর বেশি তেমনটা দেখা যায় না। বিশেষ করে শীতকালে কুয়াশা বা তীব্র বৃষ্টির সময় ওই লাইট দৃশ্যমাণ হয় না।
উন্নত দেশে উচ্চগতির সড়কে যানবাহন বিকল হলে একটু দূরে বিকন বাতি বা রিফ্লেক্টটর কোন জ্বালিয়ে রাখাসহ নানা চর্চা রয়েছে জানিয়ে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের সাইদুর রহমান বলেন, “আমাদের এখানে করাপশন ছাড়া কোথাও আর কোনো প্র্যাকটিসই নাই। অথচ প্রতিদিনই মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এসব বিষয় নিয়ে শক্ত আইনগত পদক্ষেপ দরকার।”
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি যে চালকদের জন্য ‘বিরাট সমস্যা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভাড়ার মাইক্রোবাস চালক মো. বাবুলের কথাতেও তা উঠে এল।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে বাঁ পাশের লেইনে এটা বিরাট সমস্যা। বড় বাস-ট্রাকে তো চালকের বাঁ পাশে হেলপার বসা থাকে, সামনে অন্য গাড়ি থাকলেও তারা বাঁ পাশটা দেখতে পায়। কিন্তু আমরা যারা হেলপার ছাড়া ছোট গাড়ি চালাই, তাদের জন্য বিপদটা বেশি।”
বাবুল বলেন, “ট্রাকগুলা তো লাইটও ঠিকমতো জ্বালায় না, অনেক ট্রাকের পেছনে ব্যাকলাইটই থাকে না। গাড়ির পিছনে খালি একটা ডাল ঝুলায় দেয়।”
পুলিশ বলছে, কার, এসইউভি (জিপ) বা মাইক্রোবাসের মত ছোট যানবাহনের চালকেরা প্রায়ই গতিসীমা মানেন না। ফলে সামনে অন্য কোন যানবাহন পড়লে গতি নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য কঠিন হয়।
ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের পথে প্রায় ২০ বছর বাাস চালান আব্দুল জব্বার। তিনি জানান, পরিবহনের লোকেরা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা যানবাহনকে বলে ‘জমা গাড়ি’।
“আগে রাস্তার পাশে জমা গাড়ি থাকত অনেক। আমরা সেভাবেই চালাতাম। কিন্তু এখন এই চন্দ্রা থেকে একেবারে রংপুর পর্যন্ত রাস্তা অনেক ভালো, একেবারে এক্সপ্রেসওয়ে। সেভাবে গাড়ি থাকে না। এই রাস্তায় সব গাড়িই অনেক বেশি গতিতে চলে। সামনে হঠাৎ কোনো গাড়ি দেখলে কন্ট্রোল করা মুশকিল।
“হয় ওই গাড়ির পিছে গিয়ে ধাক্কা দেয়, আর না হলে কড়া ব্রেক করে পাল্টি খাওয়ার ঘটনা এখন অনেক ঘটতেছে। আমরা সব সময় হেলপারকে বলে রাখি যেন বাম পাশটা ঠিকমতো দেখে।”
ট্রাক চালক মো. ইস্রাফিলের বাড়ি কুষ্টিয়ায়, তবে ট্রাক নিয়ে সারা দেশেই যেতে হয় তাকে। তিনি বললেন, ঢাকা থেকে বের হওয়ার মুখে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ কীংবা নরসিংদীর সড়কগুলোর দুই পাশে প্রতি রাতে শত শত বাস-ট্রাাক পার্ক করা থাকে।
আর ট্রাকে লোড থাকলে হঠাৎ কোনো সমস্যাা হলে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে পড়া ছাড়া তাদের কোন উপায় থাকে না বলে এই চালকের ভাষ্য।
“প্রত্যেকটা নতুন ট্রাকের সঙ্গে কোম্পানি থেকেই একটা তিনকোণা বাতি (রিফ্লেক্টর) দিয়ে দেয়, যাতে কোথাও গাড়ি বিকল হলে একটু দূরে নিয়ে সেটা খাড়া করে লাগানো যায়। কিন্তু ড্রাইভার-হেলপাররা এই কষ্টটা করতে চায় না, বা অনেকে জানেই না।”
এ বিষয়ে আইনের প্রয়োগ ও প্রচার চালানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ট্রাকচালক ইস্রাফিল।
