২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 04 Jun 2026, 08:46 AM
কেউ প্রাথমিক দলেই ছিলেন না, কেউ প্রাথমিক দলে থাকলেও চূড়ান্ত দলে ছিলেন না। কিন্তু সতীর্থের চোটে শেষ পর্যন্ত জায়গা পান বিশ্বকাপ দলে। ভাগ্যের ছোঁয়ায় দলে এসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাওয়া কয়েকজন খেলোয়াড়কে সামনে এনেছে ফিফা।
ট্রেন্ট অ্যালেকজ্যান্ডার-আর্নল্ড, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, ফিল ফোডেন, ডিন হাউসেন, জোয়াও পেদ্রো, কোল পামারদের বিশ্বকাপে স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে গেছে। সত্যিই কি? ভাগ্যক্রমে বাদ পড়া কারও জন্য স্বপ্নের দুয়ার তো খুলেও যেতে পারে!
প্রতি আসরেই চোটের জন্য বিশ্বকাপের আগে কিংবা মাঝপথে হয় কিছু অদলবদল। ফিফা এমন ছয় জনকে সামনে এনেছে যারা এভাবে ডাক পেয়ে হয়েছিলেন বিশ্বজয়ী।
আলদাইর ও রোনালদাও
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪
আলদাইর ও মার্সিও সান্তোস সম্ভবত তর্কসাপেক্ষে ব্রাজিলের ইতিহাসের সেরা সেন্টার-ব্যাক জুটি গড়ে তোলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র আসরের আগে পছন্দের তালিকায় তাদের অবস্থান ছিল অনেক পেছনে।
কার্লোস আলবের্তো পেরেইরার ২২ জনের দলেই ছিলেন না আলদাইর। রাশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের ছয় সপ্তাহ আগে কোচ যে দল ঘোষণা করেন, সেটায় ছিলেন কার্লোস মোজের। কয়েক সপ্তাহ পর বিতর্কিতভাবে তাকে বাদ দেন ব্রাজিল দলের চিকিৎসকরা। দলে ডাক পান আলদাইর।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের তিন দিন আগে ঊরুর চোটে ছিটকে যান রিকার্দো গোমেস। শুরুর একাদশে তার খেলা ছিল প্রত্যাশিত। জাপান থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেকে আনা হয় আরেক ডিফেন্ডার রোনালদাওকে। অফ সিজন থাকায় অনেক খেলোয়াড়ই ছিলেন খেলার বাইরে। তাই চমক জাগিয়ে জাপানের ক্লাব শিমিজু এস-পালসে খেলা ২৮ বছর বয়সী ডিফেন্ডারকে ডাকেন ব্রাজিল কোচ।
রাশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়েন রিকার্দো রোচা। মাঠে নামেন আলদাইর। এরপর টুর্নামেন্টের প্রতিটি মিনিট খেলেন তিনি। ব্রাজিলের চতুর্থ শিরোপা জয়ে রাখেন বড় ভূমিকা।
বিশ্বকাপ দলে জায়গা না পেয়ে ভীষণ হতাশ ছিলেন আলদাইর। কেমন ছিল সেই সময়টা, বলেছেন তিনি।
“স্বাভাবিকভাবেই আমি সব আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। মোজেরের জায়গায় আমি ডাক পেয়েছি, এটা জানাতে একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করেছিলেন। আমি ফোন রেখে দিয়েছিলাম, তার কথা বিশ্বাস করিনি। এরপর, সুযোগ পাওয়া, খেলা এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া, বর্ণনাতীত ছিল। শুরুর চূড়ান্ত দলটায় থাকার চেয়েও সম্ভবত এটা আরও ভালো হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ম্যাচ খেলতে পারেননি রোনালদাও। তবে বাড়ি ফিরেন তিনি সোনার পদক নিয়ে। পরে তিনি মজার ছলে ‘অবশেষে ১৭ বছর বয়সী সতীর্থ ও রুম-মেট রোনালদোর নাক ডাকার শব্দ থেকে মুক্তি পাওয়ার’ কথা বলেছিলেন!
রিকার্দিনিয়ো
দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান ২০০২
আসর শুরুর আগের দিন ব্রাজিল অধিনায়ক এমেরসন জানান, রিভালদোর শট ঠেকাতে গিয়ে নড়ে গেছে তার কাঁধের হাড়। সে সময় রিকার্দিনিয়ো ছুটি কাটাচ্ছিলেন ১৯ হাজার কিলোমিটার দূরে কুরিচিবায়। শুনেছিলেন, ব্রাজিল অধিনায়ককে হয়তো দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। লুইস ফেলিপে স্কলারির দলে কখনও সুযোগ না পাওয়ায় রিকার্দিনিয়ো ভেবেছিলেন, তার ডাক পাওয়ার ‘সম্ভাবনা শূন্য।’ তাই ফোন বন্ধ করে চার্চে চলে যান তিনি।
সৌভাগ্যবশত তার স্ত্রী জুলিয়ানা ‘মিরাকলে বিশ্বাস করতেন’ বলে ফোন অন করেন এবং সিবিএফ প্রধান আমেরিকো ফারিয়াকে বলেন, চার্চ থেকে ফেরা মাত্রই রিকার্দিনিয়ো রওনা হবেন। মেয়াদ ছিল না পাসপোর্টের, জাপানে ব্রাজিলিয়ান দূতাবাসের হস্তক্ষেপে সেটা নবায়নের বিশেষ অনুমোদন মেলে। সাউ পাওলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে রিকার্দিনিয়ো পৌঁছান দক্ষিণ কোরিয়ায়।
ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের পথে তিনটি ম্যাচে বদলি হিসেবে খেলেন রিকার্দিনিয়ো। এমেরসনের চোটে নেতৃত্ব পান কাফু। ইয়োকোহামায় তিনিই ব্রাজিলের পঞ্চম ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
স্কোড্রান মুস্তাফি
ব্রাজিল ২০১৪
সাম্পদরিয়া ডিফেন্ডার স্কোড্রান মুস্তাফির জন্য ওই এক মাস ছিল পাগলাটে। জাতীয় দলের হয়ে কোনো ম্যাচ না খেলেই ইওয়াখিম লুভের দেওয়া ২৭ সদস্যের প্রাথমিক দলে ডাক পান তিনি। ৮ মে দেওয়া দলে চোটজর্জর মৌসুমের জন্য উপেক্ষিত থাকেন মারিও গোমেস, ইলকাই গিনদোয়ান। চোটের জন্য ছিটকে যান লার্স বেন্ডার। ২ জুন ঘোষিত ২৩ সদস্যের দল থেকে বাদ পড়েন মুস্তাফি, মার্সেল শ্মেলজার ও কেভিন ভলান্ড।
পাঁচ দিন পর শুরুর একাদশের প্রত্যাশিত খেলোয়াড় মার্কো রয়েস ছিটকে যান চোটের জন্য। এরপর দলে কেবল একজন স্ট্রাইকার থাকার পরও জার্মানি কোচ ডাকেন মুস্তাফিকে। ব্রাজিলে এই ডিফেন্ডার খেলেন তিনটি ম্যাচে।
অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারায় জার্মানি। মারাকানায় প্যারেডের সময় পিঠে ‘রয়েস ২১’ লেখা জার্মানির একটা জার্সি নিয়ে উদযাপন করেন মুস্তাফি।
থিয়াগো আলমাদা ও আনহেল কোররেয়া
কাতার ২০২২
১১ নভেম্বর ২৮ জনের দল থেকে লিওনেল স্কালোনি যখন ২৬ জনের চূড়ান্ত দল বেছে নেন, তখন বাদ পড়ে যান ফাকুন্দো মেদিনা ও আনহেল কোররেয়া। এর ছয় দিন পর, পেশিতে চোট পান নিকো গন্সালেস। তার জায়গায় ডাক পান আতলেতিকো মাদ্রিদ উইঙ্গার কোররেয়া।
পরের দিন চোট পেলেন হোয়াকিন কোররেয়া। এবার ডাক পেলেন আটলান্টা ইউনাইটেড প্লেমেকার থিয়াগো আলমাদা। তিনি এমনকি প্রাথমিক দলেও ছিলেন না।
সেই সময়টার দিকে ফিরে চাইলেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া আলমাদা।
“ডাক পেয়ে আমি কেঁদেছিলাম। এরপর আমি যখন আমার পরিবারকে জানালাম, তখন তারাও কেঁদেছিল। বাবা দিবসের জন্য আমি বাবাকে বিশ্বকাপের টিকেট দিয়েছিলাম। আর এখন আমিই সেখানে যাচ্ছিলাম! কাঁন্নার জন্য খুব বেশি সময়ও হাতে ছিল না, কারণ ওই রাতেই আমাকে বিমানে চড়তে হয়েছিল।”
কোররেয়া ও আলমাদা একটি করে ম্যাচে বদলি হিসেবে খেলার সুযোগ পান। নিজের পঞ্চম চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের অনিবর্চনীয় স্বাদ পান লিওনেল মেসি।