Published : 16 Aug 2025, 12:09 AM
আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্করেজ শহরের আবাসন ব্যবসায়ী বিউ ডিসব্রোর কাছে এমন একটি ফোন এল, যা এর আগে কখনো তিনি পাননি।
সাধারণত হিমবাহ দেখতে আসা পর্যটক কিংবা ব্যবসায়িক কাজে আসা লোকজনই স্বল্প সময়ের জন্য তার কাছে বাড়ি ভাড়া চেয়ে থাকেন। কিন্তু এবার ফোনটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস থেকে, যারা মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দেখভাল করে থাকেন।
বিউ ডিসব্রো বলছেন, “আমার বেশির ভাগ বাসা আগেই ভাড়া হয়ে গিয়েছিল। তবে আমি কিছু মানুষকে একসঙ্গে একটি বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করতে পেরেছি।”
শুক্রবার আলাস্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে যে বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক হতে যাচ্ছে, তার আগে বিউ ডিসব্রোর কাছে মার্কিন গোয়েন্দাদের ফোনই শেষ অনুরোধ ছিল না।
মার্কিন গোয়েন্দাদের সঙ্গে কথা শেষ না হতেই তার কাছে একই ধরনের অনুরোধ আসে নিউ ইয়র্কের রুশ দূতাবাস থেকেও। কিন্তু বাসা ফাঁকা না থাকায় রুশ কর্মকর্তাদের তিনি এক বন্ধুর ঠিকানা দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন, যার বাসা ফাঁকা ছিল।
সপ্তাহ খানেক আগে ট্রাম্প যখন আলাস্কা বৈঠকের ঘোষণা দেন, তখনই ‘লাস্ট ফ্রন্টিয়ারে’ (আলাস্কা) নিযুক্ত সিক্রেট সার্ভিসের একমাত্র এজেন্টের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়।
তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শত শত সদস্যকে প্রস্তুত রাখার কাজ শুরু করে দেন।
সেখানে এজেন্সির কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। কেননা তাদের ঘাড়ে একই সঙ্গে এমন দুজন প্রেসিডেন্টের সুরক্ষার দায়িত্ব পড়েছে, যাদের প্রত্যেকেই প্রায় সব সময়ই সশস্ত্র নিরাপত্তা ঘেরাটোপের মধ্যে থাকেন।
বৈঠকের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত আছেন, এমন চারজন বলছেন, মাত্র এক সপ্তাহ সময় থাকায় দৌড়ঝাঁপের মধ্যে কাজগুলো করতে হয়েছে।
তারা বলছেন, বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হওয়ায় সিক্রেট সার্ভিসের লোকজন কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও চিকিৎসাব্যবস্থা স্থানান্তর করতে পেরেছেন। কিন্তু অ্যাঙ্করেজের ভৌগোলিক অবস্থানটাই বেশ কিছু জটিলতা তৈরি করে।
অ্যাঙ্করেজ শহরে পর্যাপ্ত হোটেল নেই। গাড়ি ভাড়াও খুব একটা পাওয়া যায় না। ফলে গাড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম আলাস্কার অন্যান্য এলাকা থেকে আনতে হয়েছে।
ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠক শুরু হবে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত দেড়টায়। আলাস্কার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি— এলমেনডোর্ফ-রিচার্ডসনে হবে এ বৈঠক।
স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার এ ঘাঁটি থেকে রাশিয়ার দূরত্ব এক হাজার মাইলের কম। এর আকাশসীমা নিয়ন্ত্রিত। ঘাঁটির ফটকগুলো বেশ সুরক্ষিত এবং জনসাধারণের জন্য এ ঘাঁটি উন্মুক্ত নয়।
দুই নেতার বৈঠকের বিষয়ে আলাস্কার গভর্নর মাইক ডানলেভি বৃহস্পতিবার ব্লুমবার্গ টেলিভিশনকে বলেন, “এখন পর্যটনের ভরা মৌসুম চলে। এ সময় হোটেল কিংবা গাড়ি পাওয়াটা বেশ কঠিন। ফলে ঘাঁটিতে বৈঠক হলে ঝামেলা কম হবে।”

অ্যাঙ্করেজ শহরটি অবশ্য এর আগে পোপ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানকেও আতিথেয়তা দিয়েছে।
“কিন্তু শুক্রবারের বৈঠকটি হতে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত শহরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক,” বলেন ডানলেভি।
বৈঠকের বেশির ভাগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে যে সৌজন্য থাকবে, তা পুতিনের জন্যও নিশ্চিত করা হবে। রাশিয়ার কর্মকর্তারা পুতিনকে ঘিরে থাকবেন; অন্যদিকে বাইরের স্তরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা।
বৈঠকের প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, এক পক্ষ আরেক পক্ষের দরজা খুলে দেবে না কিংবা একে অপরের গাড়িতেও চড়বে না। যদি বৈঠকের কক্ষের এক পাশে সিক্রেট সার্ভিসের ১০ জন সদস্য থাকেন, তাহলে আরেক পাশে রাশিয়ার ১০ জন এজেন্ট থাকবেন। মানুষ কিংবা অস্ত্র— সবই থাকবে সমান সমান।
গাড়িবহর কিংবা দোভাষীর ক্ষেত্রেও সমান সমান হিসাব বজায় থাকবে। দুই পক্ষই নিজেদের মতো করে দোভাষী নিয়ে আসবে।
বৈঠকের প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা বলছেন, পুরো নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিষয়ে সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা এখনও রুশ কর্মকর্তাদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সিক্রেট সার্ভিসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড়। নিরাপত্তার স্বার্থে দুই নেতার বৈঠকের সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে সিক্রেট সার্ভিস বিস্তারিত কিছু জানাবে না।”
ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠকে দায়িত্ব পালন করতে কয়েকশ এজেন্ট এরই মধ্যে অ্যাঙ্করেজ শহরে পৌঁছে গেছেন। শহরের সব হোটেল এখন ভরা।
গাড়িবহরের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ভাড়াচালিত গাড়ি। সড়কের মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। দোকানপাট কিংবা বাজারের মধ্যে মিশে আছেন সাদা পোশাক পরা সদস্যরাও।
এ বৈঠককে ট্রাম্প বর্ণনা করেছেন ইউক্রেইন যুদ্ধের ইতি টানার একটা প্রচেষ্টা হিসেবে। এটি আঞ্চলিক চুক্তির একটা অংশ হতে পারে, এমন আভাসও দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে যুদ্ধে ইতি টানার প্রচেষ্টা চালানোয় ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন পুতিন। এছাড়া অর্থনৈতিক সযোগিতার পাশাপাশি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চুক্তির সম্ভাবনার কথাও শুনিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন
আলাস্কার পর দ্বিতীয় বৈঠকে জেলেনস্কিকে রাখার আশা ট্রাম্পের
আলাস্কা বৈঠক থেকে কী চান পুতিন ও ট্রাম্প?
ইউক্রেইনে যুদ্ধ বন্ধে ১৫ অগাস্ট আলাস্কায় ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক