Published : 11 Feb 2026, 02:34 PM
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যে আলোচনা যখন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে, সেসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আরও একবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানাতে যাচ্ছেন।
বুধবারের বৈঠকে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং হামাস, হিজবুল্লাহর মতো ছায়া গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনে ইতি টানতে তেহরানকে বাধ্য করা যায়, এমন চুক্তিতে পৌঁছাতে চাপ দেবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
“এই আলোচনার মূলনীতিগুলো কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করবো আমি,” যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ইরান জানিয়েছে, তাদের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে রাখা নিষেধাজ্ঞা তুলতে পশ্চিমা দেশগুলো রাজি না হওয়া পর্যন্ত তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমাবে না।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে ঢোকার পর এ নিয়ে ষষ্ঠবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন নেতানিয়াহু, আর কোনো দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের এত অল্প সময়ে কখনোই এতবার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ মেলেনি।
রিপাবলিকান ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপও দিয়েও আসছেন।
“যে কোনো আলোচনায় অবশ্যই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং ইরানি অক্ষশক্তির প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয়টি থাকা উচিত বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন,” সফরের আগে দেওয়া বিবৃতিতে এমনটাই বলেছে নেতানিয়াহুর কার্যালয়।
এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর নতুন সফর হতে যাচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত মধ্যপ্রাচ্যে তার সমরশক্তি বাড়িয়েই চলছে। পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি করতে ব্যর্থ হলে ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
মঙ্গলবার মার্কিন এ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বিমানবাহী রণতরী নেতৃত্বাধীন নৌবহর পাঠানোর কথা ‘ভাবছেন’।
ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের রক্তক্ষয়ী ‘ক্র্যাকডাউনের’ পাল্টায় ট্রাম্প গত মাসে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন। এরপরই মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।
“আমাদের বিশাল এক নৌবহর রয়েছে যা সেদিকে যাচ্ছে, আরও একটি যেতে পারে,” এক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ কথা বলেন।
তিনি জানান, ইরান ‘খুব করে’ একটা চুক্তি করতে চাইছে এবং তিনিও কূটনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী।
এদিকে ইসরায়েলের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো পরমাণু চুক্তিতে না পৌঁছায় তাহলে দেশটিতে হামলা চালানোর অধিকার তাদের রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের সঙ্গে এমন বিস্তৃত চুক্তি করে, যেখানে ইসরায়েলের সরকারের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো দূর হয়, তা নিশ্চিতে ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগাতে নেতানিয়াহুর ওপর তার সরকারের কট্টর-ডানপন্থি অংশ ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।
“তড়িঘড়ি চুক্তি করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) হয়তো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টা নাও রাখতে পারেন, কিংবা পরমাণু কর্মসূচির অবশেষ থেকে যাবে এমন কোনো পদক্ষেপের অনুমতিও দিয়ে বসতে পারেন, এ ধরনের উদ্বেগ রয়েছে ইসরায়েলের,” বলেছেন জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যান বাইমান।
“ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু অর্জন করার চাইতেও বেশি চান একটি চুক্তি করতে, তার অধীনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ইসরায়েল ও অন্য মিত্রদের এমনই উদ্বেগ রয়েছে,” বলেছেন তিনি।
গত বছর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা, তার কয়েক মাস পর শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ, সব মিলিয়ে ইরানি শাসকরা এখন ভয়াবহ দুর্বল অবস্থানে আছে বলে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন।
“ইরানি শাসকরা এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মনে করছে, তাদের হাতেই সব ধরনের কার্ড রয়েছে, ইরানও ব্যাকফুটে, তাই তারা সর্বোচ্চ সংখ্যক দাবি আদায় করে নিতে পারবে,” বলেছেন নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞা মোহাম্মদ হাফেজ।
ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদেই ইরানের সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমলে হওয়া একটি পরমাণু চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনকে বের করে এনেছিলেন। নতুন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে গত বছর থেকে তার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়তে দেখা গেলেও কোনো পরমাণু চুক্তি হলে ট্রাম্প হয়তো সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়াতে পারবেন, বলেছেন সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা।
“নির্বাচনের (মধ্যবর্তী) বছরে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত চাইবেন বলে আমার মনে হয় না। ধারণা করছি, ইরানিরাও এটা বোঝে,” বলেছেন ইরাক ও তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস জেফরি।
নেতানিয়াহুর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর এমন সময়ে হচ্ছে যখন গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরবর্তী ধাপ কার্যকর করা নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আলোচনাও চলছে।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে ভালো কোনো বন্ধু ইসরায়েল তার ইতিহাসে পায়নি।”
“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক গাজা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক জোরদারে আমরা আমাদের মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছি,” বলেছেন মুখপাত্র আনা কেলি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের আক্রমণের পর শুরু হওয়া দুই বছরের গাজা যুদ্ধ গত বছরের অক্টোবরে এক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে থামে। ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের ওই আক্রমণে আনুমানিক এক হাজার ২০০ মানুষ নিহত হয়েছিল, জিম্মি করা হয়েছিল আড়াইশ জনকে। এর পাল্টায় তেল আবিবের নির্বিচার হামলায় ৭১ হাজারের বেশি মানুষ মারা পড়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর প্রথম ধাপে হামাস ও ইসরায়েল একে অপরের বিরুদ্ধে নিয়মিতই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছিল।
হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজা থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং উপকূলীয় ভূখণ্ডটির পুনর্গঠন চাওয়া চুক্তিটির দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনায় এখন পর্যন্ত খুব বেশি অগ্রগতির খবর মেলেনি।