Published : 05 Jan 2026, 01:03 AM
যুক্তরাষ্ট্র শনিবার ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যায়। এরপর ভেনেজুয়েলার আদালতের আদেশে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।
তার প্রতি সব বিচার বিভাগীয় এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সমর্থন আছে। তিনি মাদুরোর আস্থাভাজনদেরই একজন। শনিবার রদ্রিগেস রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে মাদুরোর মুক্তি দাবি করেন এবং বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার ‘একমাত্র প্রেসিডেন্ট’।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি, নিরাপদ ও যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মাদুরো না থাকলেও ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা ধরে রেখেছেন তার শীর্ষ মিত্ররা।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এই পরিচালনা কীভাবে হবে বা কারা এতে জড়িত থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি। তিনি কেবল বলেন, এটি হবে একটি দলগত প্রচেষ্টা।
ট্রাম্প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগসেরর সঙ্গে কথা বলছেন। ট্রাম্পের দাবি, রদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্র যা চাইবে, তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু রদ্রিগেজ প্রকাশ্যে মাদুরোকে যে সমর্থন দিচ্ছেন এবং ভেনেজুয়েলাকে একটি সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হতে দেবেন না বলে যে মন্তব্য করছেন তা ট্রাম্পের ওই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।
রদ্রিগেজ ও তার ভাই জর্জ এখন ভেনেজুয়েলার কংগ্রেসের নেতৃত্বে। মাদুরো ২০১৩ সালে যখন ক্ষমতা নিয়েছিলেন তখন থেকেই এই দুইজন ছিলেন উদীয়মান ব্যক্তিত্ব।
এছাড়াও, আছেন আরেকজন সাবেক সামরিক ক্যাপ্টেন ডিওসডাডো কাবেল্লো, যিনি হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের সবাই মাদুরোকে অপহরণের নিন্দা জানিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষমতাকাঠামো রক্ষা করতে তারা সংকল্পবদ্ধ বলেই মনে হচ্ছে। নির্বাহী এই শাখার পেছনে শক্তিশালী সমর্থন হয়ে আছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনোর সশস্ত্র বাহিনী।
রদ্রিগেসকে সমর্থন জানিয়েছেন পাদ্রিনো। ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। মাদুরোকে অপহরণের নিন্দা জানান তিনিও।
ওদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলছেন, ভেনেজুয়েলা এখন কি করে সেটাই যুক্তরাষ্ট্র দেখবে এবং এর ভিত্তিতেই তারা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে। ভেনেজুয়েলার নেতারা এই অন্তর্বর্তীকালে প্রকাশ্যে কি বলছেন সেটি তাদের দেখার বিষয় নয়।
ভেনেজুয়েলার মাদুরো নাম্বার দুই এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করতে প্রস্তুত কিনা- জিজ্ঞেস করা হলে সিবিএস নিউজকে একথা বলেন রুবিও।
এক নাম্বার অভীষ্ট যুক্তরাষ্ট্রই থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার দেশ ভেনেজুয়েলাকে পরীক্ষা করবে। তারা (ভেনেজুয়েলা) যদি ঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষায় স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন পথ খোলা রাখবে।
ট্রাম্প গত শনিবার বলেছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতা কোনওটাই নেই।
মাচাদো এর আগে এডমুন্ডো গনজালেসকে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে গঞ্জালেজের পক্ষে তিনি ব্যাপক সমর্থন জোগাড় করেন এবং তার দলের প্রকাশিত ভোটের ফল অনুযায়ী গঞ্জালেস বড় ব্যবধানে জয়ী হন।
ভেনেজুয়েলায় আরেকটি যে সমস্যা এখন দেখা দিতে পারে সেটি হচ্ছে অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভূখল্ড দখল নিয়ে লড়াই। দেশটিতে অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বাড়-বাড়ন্ত আছে। যেমন: কলম্বিয়ান গেরিলা এবং বিশেষত ইএলএন।
এই গোষ্ঠীগুলো সমাজে এবং মাদকপাচার রুটগুলোতে তাদের ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে। ফলে বাস্তবে ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার প্রশ্নে কোনও একক কিংবা স্পষ্ট উত্তর পাওয়া কঠিন।
সামনে কী হতে পারে?
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় আর কোনও সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে ট্রাম্প দেশটিতে মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রশ্নে বলেছিলেন, মাঠে সেনা নামাতে আমরা ভয় পাই না।
ওদিকে, ভেনেজুয়েলায় আবার হামলা চালানো হতে পারে বলেও হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা থেকে যা চায়, তা না পেলে আবার হামলা চালানো হবে।
তিনি এও বলেছেন যে, ভেনেজুয়েলার পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর।
ওদিকে, ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় সামনের দিনগুলোতে কী করা হতে পারে সে সম্পর্কে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় ঢুকে অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।
মাটি থেকে বিপুল সম্পদ তোলা হবে, যা ভেনেজুয়েলার জনগণ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাজে লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যয় করা অর্থ ফেরত নেবে এবং অন্য দেশগুলোতে তেল বিক্রি করবে বলেও জানান তিনি।
ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ভেনেজুয়েলার ‘কৌশলগত, বিশেষ করে তেল ও খনিজ’ সম্পদ দখলের চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছে। সরকারের কথায়, যুক্তরাষ্ট্র জোর করে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভাঙার চেষ্টা করছে।
বিশ্বের প্রমাণিত সবচেয়ে বড় তেল মজুত আছে ভেনেজুয়েলায়। যদিও দেশটির তেল ভারি এবং পরিশোধন করা তুলনামূলক কঠিন, তবে তা ডিজেল ও আসফাল্ট তৈরির জন্য উপযোগী।