Published : 21 May 2026, 01:49 AM
কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক, দেশটির প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগেই মারা গেলেন।
সাড়ে ছয় দশকের বেশি সময় আগে বিশ্বজুড়ে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা এ ব্যক্তি হলেন সাবেক বেলজিয়ান কূটনীতিক এতিয়েন দাভিগনন।
৯৩ বছর বয়সি দাভিগনন সোমবার মারা যান বলে খবর দিযেছে রয়টার্স।
নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জ্যাক ডেলরস ইনস্টিটিউটের পর্ষদে ছিলেন বেলজিয়ামের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক দাভিগনন। দেশটির এই শিল্পপতি ইউরোপীয় কমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন।
লুমুম্বার দুই রাজনৈতিক মিত্র মরিস ম্পোলো ও জোসেফ ওকিতোকে হত্যার সঙ্গেও জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দাভিগননের বিরুদ্ধে।
তবে তিনি কোনো ধরনের অপরাধ করার কথা অস্বীকার করে আসছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি বিচারের জন্য প্রত্যর্পণের একটি আদেশের বিরুদ্ধে করা আপিলের রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন।
কঙ্গোতে ঔপনিবেশিক নির্যাতন মানব ইতিহাসের অন্যতম বর্বর অধ্যায়, যার শুরু উনিশ শতকের শেষে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের শাসন আমলে।
রাবার ও হাতির দাঁত সংগ্রহের জন্য স্থানীয় জনগণের ওপর সীমাহীন নিপীড়ন চালানো হয়, যার ফলে প্রায় ১ কোটি মানুষের প্রাণ যায়।
রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড বিশাল কঙ্গো অববাহিকাকে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ঘোষণা করেছিলেন। রাবার সংগ্রহের জন্য সে সময় স্থানীয় পুরুষদের ওপর অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হত। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের হাত-পা কেটে ফেলা হত বা হত্যা করা হত।
সে সময় পুরো অঞ্চলটিকে একটি বিশাল শ্রমশিবিরে পরিণত করা হয়। অনাহার, রোগ-বালাই এবং নির্বিচার হত্যার কারণে কঙ্গোর জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে।
১৯০৮ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লিওপোল্ড কঙ্গোর নিয়ন্ত্রণ বেলজিয়াম সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। এরপর সরাসরি বেলজিয়ান রাষ্ট্রীয় উপনিবেশ হিসেবে এর শাসন চলতে থাকে।
কঙ্গোলিজদের জন্য কঠোর বর্ণবাদী নীতি প্রণয়ন করা হয়। স্থানীয়দের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ছিল কেবল নামমাত্র।
রাবারের পাশাপাশি তখন তামা, ইউরেনিয়াম ও হীরার মত মূল্যবান খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য স্থানীয় শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হত।
ঔপনিবেশিক আমলের শোষণ ও সম্পদ লুণ্ঠন কঙ্গোকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মুখে ফেলে দেয়।
প্যাট্রিস লুমুম্বার মত নেতাদের নেতৃত্বে কঙ্গোর জনগণ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। প্রজাতন্ত্রের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হন লুমুম্বা।
১৯৬০ সালের ৩০ জুন কঙ্গোর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বেলজিয়ামের রাজা বোদোয়াঁ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশংসা করলে লুমুম্বা তার প্রতিবাদে ইউরোপীয় শোষণ ও নিষ্ঠুরতার তীব্র সমালোচনা করেন। ওই বক্তব্য পশ্চিমা দেশগুলোকে তার বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়।
লুমুম্বা আফ্রিকান জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং বেলজিয়ামের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেছিলেন, লুমুম্বা কঙ্গোর খনিজ সম্পদ পশ্চিমা দেশগুলোর নাগালের বাইরে নিয়ে যাবেন।
তাই বছর না ঘুরতেই কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামের এ নায়ককে বেলজিয়াম ও পশ্চিমা শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়।
পশ্চিমা ও বেলজিয়ান মদদপুষ্ট কঙ্গোর বিদ্রোহী সামরিক কর্মকর্তারা লুমুম্বাকে বন্দি করেন। ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি লুমুম্বা, মরিস এমপোলো এবং জোসেফ ওকিটোকে একটি বেলজিয়ান ক্রু চালিত বিমানে করে কাতাঙ্গা প্রদেশে নেওয়া হয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সেখানে বেলজিয়ান কর্মকর্তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে লুমুম্বাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। সেই সন্ধ্যায় এক বেলজিয়ান অফিসারের নেতৃত্বে সৈন্যরা তাদের গুলি করে হত্যা করে। ওই হত্যাকাণ্ডে বেলজিয়ানদের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিভিন্ন নথিতে এসেছে।
মৃত্যুর পর যাতে তার অনুসারীরা তার সমাধিকে প্রতিবাদের প্রতীক বানাতে না পারে, সেজন্য হত্যাকারীরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয়।
তৎকালীন কাতাঙ্গীয় জাতীয় পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে থাকা বেলজিয়ান পুলিশ কমিশনার জেরার্ড সোয়েটের সাক্ষ্য অনুসারে, ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর লুমুম্বার মরদেহ ২২০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হয়। এক বনভূমির মাঝে উইঢিবির পিছনে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয় লাশ।
ওই হত্যাকাণ্ডকে বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় এবং আফ্রিকান দেশগুলোর মুক্তি সংগ্রামের এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ শতকের আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ১৫ বছর আগে দায়ের করা এক মামলায় অভিযুক্ত শেষ জীবিত ব্যক্তি ছিলেন দাভিগনন। তার আগের ১০ আসামিও মারা গেছেন।
কৌঁসুলিরা বলছেন, হত্যার আগে লুমুম্বাকে বেআইনিভাবে আটক ও স্থানান্তরে অংশ নিয়েছিলেন সেই সময়ের তরুণ কূটনীতিক এতিয়েন দাভিগনন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে একটি নিরপেক্ষ বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন।
লুমুম্বার পরিবার বলেছে, দাভিগননের মৃত্যু হলেও হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকার কথা বিচারের নথি থেকে মুছে যাবে না। সর্বশেষ জীবিত অভিযুক্তের মৃত্যুতে ঐতিহাসিক রেকর্ডের সমাপ্তি ঘটবে না।
তাদের আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, তারা বেলজিয়াম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দেওয়ানি অভিযোগের মত আরও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রয়টার্স লিখেছে, কঙ্গোতে দায়িত্ব পালনের পর দাভিগনন বেলজিয়ামের প্রশাসনে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।
তিনি ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী পল হেনরি স্পাকের মন্ত্রিপরিষদ প্রধান এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বেলজিয়ান এবং বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির পর্ষদেও দায়িত্ব পালন করেন দাভিগনন।