গাজায় অনাহার যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে: জাতিসংঘ কর্মকর্তা

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে পরিসংখ্যানগত একগুচ্ছ প্রমাণ তুলে ধরে বলা হয়েছে গাজায় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ আসন্ন।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 March 2024, 02:28 PM
Updated : 28 March 2024, 02:28 PM

গাজার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল। যেটি যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভলকার তুর্ক।

প্রায় ছয় মাস ধরে গাজায় ইসরায়েলের অভিযান চলছে এবং ছোট্ট এই ভূখণ্ডটির ২৩ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তার অভাবে সেখান চরম মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে জাতিসংঘ থেকে বার বার গাজায় যেকোনো সময় দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে পরিসংখ্যানগত একগুচ্ছ প্রমাণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, গাজায় মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ আসন্ন। দ্রুত পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী মে মাস নাগাদ সেখানে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনানুযায়ী গাজার সাধারণ ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা ইসরায়েল দায়িত্ব। যে দায়িত্ব পালনে এবং গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ এবং বিতরণের মাধ্যমে তা জনগণের মধে পৌঁছে দিতে জাতিসংঘ ইসরায়েলের উপর চাপ বাড়ানো চেষ্টা করছে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভলকার তুর্ক বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। এবং সেখানে কয়েকটি ঘটনার ‘বিশ্বাসযোগ্য’ তথ্য পাওয়া গেছে। যা প্রমাণ করে ইসরায়েল গাজা যুদ্ধে অনাহারকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

“যদি তাদের এই অভিপ্রায় প্রমাণিত হয় তবে তা যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হবে।”

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার তুর্কের এই বক্তব্যকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী নির বারকাত। বলেন, “এটা সম্পূর্ণরূপে দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা।”

ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার অন্যান্য মন্ত্রীর মত তিনিও দাবি করেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্ব থেকে আসা ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে।

“একসময় হামাস নিজেদের সাহায্য করার পর যা পড়ে আছে সেটুকু বরং বিতরণ করতে ব্যর্থ জাতিসংঘ।”

তবে ইসলায়েল যতই দাবি করুক যে তারা গাজায় ত্রাণ প্রবেশ ও বিতরণে বাধা দিচ্ছে না। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। মিশর সীমান্তে গাজার রাফাহ ক্রসিংয়ে ওপারে ত্রাণবোঝাই লরির লম্বা লাইন পড়ে গেছে। কিন্তু রাফাহ ক্রসিং দিয়ে সেগুলোকে গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েলি বাহিনী। তারা শুধু ইসরায়েলের উপর দিয়ে গাজায় কিছু ত্রাণের লরির প্রবেশ করতে দিচ্ছে। তাও অনেক জটিল প্রক্রিয়া এবং আমলাতান্ত্রিক নানা যাচাই-বাছাইয়ের পর।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পর এবার জর্ডান বাধ্য হয়ে আকাশ থেকে গাজায় ত্রাণ ফেলছে। যে ত্রাণ পেতে মরিয়া ফিলিস্তিনিরা মারামারি করছে।

আকাশ থেকে প্যারাসুটে বেঁধে ত্রাণের প্যাকেট ফেলা হচ্ছে। কখনো কখনো প্যারাসুট ঠিকমত না খোলায় ত্রাণের ভারি প্যাকেট নিচে থাকা ফিলিস্তিনিদের উপর সরাসরি গিয়ে পড়ছে। আকাশ থেকে পড়া ত্রাণের প্যাকেটের আঘাতে কয়েকজন ফিলিস্তিনি মারাও গেছে।

আবার ত্রাণ বাঁধা প্যারাসুট উড়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়ছে। মরিয়া ফিলিস্তিনিরা সাঁতরে গিয়ে সেগুলো সংগ্রহ করতে যেয়ে ডুবে মারা গেছে।

সমুদ্র পথে ত্রাণ সরবরাহ করতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী গাজা উপকূলে একটি ভাসমান ঘাট নির্মাণ কাজ শুরু করেছে।

অথচ এ সব কিছুই প্রয়োজন হতো না যদি ইসরায়েল সড়ক পথে পূর্ণ গতিতে গাজায় ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি এবং গাজা স্ট্রিপ থেকে উত্তরে মাত্র আধা ঘন্টার পথ দূরে আশদোদের আধুনিক কন্টেইনার বন্দরের মাধ্যমে ত্রাণ সরবরাহ ত্বরান্বিত করতে দিত।

জেনেভায় বসে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তুর্ক আরও বলেন, যেসব প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ইসরায়েল গাজায় ইচ্ছা করে ত্রাণ বিতরণের গতি কমিয়ে দিচ্ছে বা একেবারে বন্ধ করে দিচ্ছে।

তিনি গত ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ইসরায়েলের উপর করা হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে এও বলেছেন, একটি যুদ্ধে উভয় পক্ষকে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। এমনকি যদি গাজার অসহায় মানুষদের জন্য ত্রাণ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটারও জবাবদিহি করতে হবে।

“আমার মানবিক সহকর্মীদের সবাই আমাদের বলছেন, গাজায় প্রচুর বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে, অনেক বাধা আছে। প্রতিবন্ধকতা আছে... ইসরায়েলকে এজন্য উল্লেখযোগ্যভাবে দোষী বলা যায়।

“আমি কেবলমাত্র তাদের হয়ে বাস্তবতাকে তুলে ধরতে পারি … আমি বুঝতে পারছি যে এটি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, কিন্তু আমরা তাদের এটা করা থেকে বিরত রাখতে পারছি না।

“যখন আপনি সব ধরণের প্রয়োজনীয়তার কথা সবার সামনে উল্লেখ করেন, যেগুলো আসলে জরুরি অবস্থায় অযৌক্তিক…তখন প্রশ্ন উঠবেই। আমরা বর্তমানে যেসব বিধিনিষেধ দেখতে পাচ্ছি, এমনকি অনাহার নিয়েও সেখানে বিশ্বাসযোগ্য একটি দাবি করা হচ্ছে, বলা হচ্ছে, হয়তো সেখানে অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”