Published : 03 Apr 2026, 09:01 AM
ভারতের উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরের ৪২ বছর বয়সী কৃষক রমেশ কুমার তার গমক্ষেতের ধারে দাঁড়িয়ে সারের খরচ, প্রত্যাশিত ফলন আর বাজারদরের হিসাব কষছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সার এবং নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
তার মাথায় এখন ঘুরছে সন্তানের স্কুলের বেতন, সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি এবং মেয়ে বর্ষার বিয়ের জন্য জমানো টাকাসহ নানা কিছুর ভাবনা।
রমেশ বলেন, “আমি জানি না এ বছর সব খরচ মেটাতে পারব কি না। সবকিছুই নির্ভর করছে ফসলের ওপর।”
কেবল রমেশ নন, ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংকটের আঘাত লেগেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের কৃষকের জীবনযাত্রায়। গোটা অঞ্চলজুড়ে সারের ক্রমবর্ধমান দাম ও ঘাটতি কৃষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
নিঃশব্দে জেঁকে বসেছে অনিশ্চয়তা
কৃষিকাজের জন্য সার এখন জরুরি উপাদান। ইউরিয়া সারের মূল উপাদান হল প্রাকৃতি গ্যাস। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আর সরাররি যে সার আমদানি করা হয়, তারও বড় অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসে।
এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভারতে সারের দাম বেড়ে গেছে; সময়মত তা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রমেশ কুমার বলেন, “দাম আরও বাড়লে আমাদের কোথাও না কোথাও খরচ কমাতে হবে। হয়ত মেয়ের বিয়েটা পিছিয়ে যাবে। পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করানোও কঠিন হয়ে পড়বে।”
সামনেই রমেশকে তার তার বড় ছেলে ১২ বছর বয়সী অমিতের স্কুলের বেতন দিতে হবে। ছোট মেয়ে বর্ষার বিয়ের জন্য তিনি টাকা জমাচ্ছিলেন। সব মিলয়ে টানাটানির মধ্যেই তাকে সংসার চালাতে হয়।
তিনি বলেন, “কোনোরকমে চালিয়ে নিই। কিন্তু ফসল যদি ভালো না হয়, তখন আমাদের ভাবতে হয় কোনটাকে অগ্রাধিকার দেব, কোনটা বাকি রাখব।”

দূরবর্তী সংকটের স্থানীয় পরিণতি
উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যা ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় সমভূমি থেকে প্রায় ১২৪০ মাইলের বেশি দূরের এক সংকীর্ণ নৌপথ। ইরান ও ওমানের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা এ জলপথ উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোকে উন্মুক্ত মহাসাগরের মাধ্যমে বিশ্ব বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বিশ্বের তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার তৈরির জন্য অপরিহার্য বিপুল পরিমাণ এলএনজি উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে আসে । ফলে এই নৌপথ বন্ধ হওয়ার মানে হল, তেল-গ্যাসের চালান বিলম্বিত হবে, পণ্য পরিবহন ও বীমার খরচ বেড়ে যাবে।
সারের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। তাতে ফসল উৎপাদন কমে যেতে পারে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার চাপ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ এশিয়ায়ও অনুভূত হচ্ছে।
প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের আবাসস্থল দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধান খাদ্যশষ্য হল গম ও ধান। আর এসব শষ্যের ফলন সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে সারের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এই অঞ্চল জুড়ে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে ভারতে প্রায় ৪৬ শতাংশ, পাকিস্তানে প্রায় ৩৮ শতাংশ, বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং নেপালে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কৃষি খাতে নিযুক্ত। আর এই কৃষকরা সহজলভ্য সারের জন্য
হরমুজ প্রণালির ওপর কতটা নির্ভরশীল, তা তারা নিজেরাও জানেন না।
ভারত সরকার এবং বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কৃষি খাতে বার্ষিক ৪০০ বিলিয়ন ডলার লেনদেন হয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে কৃষি। ১০ কোটির বেশি কৃষক পরিবার সরাসরি এ খাতের উপর নির্ভরশীল।
সারের চাহিদা মেটাতে ভারতকে ফসফেট ও পটাশ, সেইসঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হয়। আর এসব উপাদানের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে বা সেখানই তৈরি হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তান সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির কৃষি খাত মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখে। পাকিস্তানের সার আমদানির প্রায় ২০-২৫ শতাংশ, বিশেষ করে ডিএপি (ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট) পরিবহনের কোনো এক পর্যায়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
এছাড়া ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য পাকিস্তান দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ আটকে থাকায় অন্য অনেক দেশের মত পাকিস্তানেও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশেও লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক আমদানি করা সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এখানে কৃষি খাত জিডিপিতে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ অবদান রাখে।
কৃষি খাতের জন্য বাংলাদেশকে আমদানি করা সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট এবং দামের ওঠানামার কারণে কৃষকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশের আমদানি করা সারের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
নেপালেও কৃষি খাত জিডিপির প্রায় ২৪ শতাংশ অবদান রাখে, সেখানে সারের প্রায় পুরো চাহিদাই আমদানি করে মেটাতে হয়। এর প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ ভারত থেকে এবং উপসাগরীয় অঞ্চল বা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।

জীবিকা বিপন্ন
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই কোটি কোটি মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।
ভারত সরকার তাদের কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে যে, সারের সরবরাহ নিয়ে আপাতত ভয়ের কিছু নেই। তবে সেই আশ্বাসে কৃষকদের অনিশ্চয়তা কাটছে না।
ভারত-শাসিত কাশ্মীরের দক্ষিণে পাম্পোরে ৫৩ বছর বয়সী সরিষা চাষী গোলাম রসুল বলেন, “আমরা যুদ্ধ, জাহাজ চলাচলের সমস্যার কথা শুনি। কিন্তু ঘাটতি দেখা দেওয়ার আগেই সারের দাম বেড়ে যায়। তাই প্রকৃত ঘাটতি দেখা দেওয়ার আগেই কৃষকরা সারের ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে আগাম ব্যবস্থা নেন।”
তিনি বলেন, “আমরা সার কম ব্যবহার করলে উৎপাদন কমে যাবে। কিন্তু কখনও কখনও আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না।”
পাকিস্তানের দক্ষিণ পাঞ্জাবের ৪৫ বছর বয়সী গম চাষী মুনীর আহমেদ বলেন, “সারের দাম বাড়লে এখানকার সবার ওপরই এর প্রভাব পড়বে। আমাদের ঋণ আছে, খরো আছে। খরচ বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব আমাদের ওপর পড়ে।”
পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারাও সার সরবরাহ নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রানা তানভীর হুসাইন গত ২৫ মার্চ এক সভায় বলেছেন, তাদের সরকার সক্রিয়ভাবে উপসাগরীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে, অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া ও ডিএপি উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কৃষকদের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তবে ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ প্রয়োজন। আর বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সারের উৎপাদন খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে। আর কৃষি উপকরণের দাম সামান্য বাড়লেও কৃষকদের ওপর তার বড় প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের রংপুর জেলার ৪১ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, “সারের সরবরাহ ইতোমধ্যে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কখনও পাওয়া যায়, কখনও যায় না। আর যখন আসে, তখন দাম বেশি থাকে।”
নেপালের গুলমি জেলায় ৩৮ বছর বয়সী কৃষক মেঘনাথ আরিয়াল আশঙ্কা করছেন, সারের বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে ফসলের পরিমাণ কমে যাবে।
তিনিও বলেন, “সময়মত সার না এলে ফসলের ক্ষতি হয়। দাম বেড়ে গেলে আমরা এর ব্যবহার কমিয়ে দিই।”
বাংলাদেশের কৃষি সচিব রফিকুল মোহাম্মদ আল জাজিরাকে বলেন, “সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কর্মকর্তারা কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, আগামী মাসগুলোর জন্য সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৫ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য চীন ও মরক্কোর মত বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
নেপালের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রাম কৃষ্ণ শ্রেষ্ঠা বলেন, সার বিতরণ পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের জন্য সারের সরবরাহ ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের ফলে চুক্তির চালানগুলো আসা যে বিলম্বিত হতে পারে, সে কথা তুলে ধরে সতর্ক করেছেন তিনি।