Published : 05 May 2026, 03:51 PM
ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ বন্ধ করতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করলেও তেহরানের সেই সক্ষমতায় বড় কোনো আঘাত হানতে পারেনি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী।
রয়টার্স জানিয়েছে, গত দুই মাসের যুদ্ধে একের পর এক হামলা সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সময়সীমা (টাইমলাইন) আগের মতোই রয়ে গেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের প্রয়োজনীয় সময় গত বছরের গ্রীষ্মকালের পরিস্থিতির মতোই আছে।
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের পরমাণু সক্ষমতাকে প্রায় এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল।
এরপর চলতি বছর দুই মাস ধরে নতুন করে যুদ্ধ চললেও সেই সময়সীমার কোনো নড়চড় হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের প্রথাগত সামরিক ঘাঁটি ও শিল্প স্থাপনা।
যদিও ইসরায়েল বেশ কিছু পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে, তবে ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনও অক্ষত।
গোয়েন্দাদের মতে, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সত্যিকার অর্থে পঙ্গু করতে হলে তাদের কাছে থাকা এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হয় ধ্বংস করতে হবে, না হয় সেখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
গত জুনে মার্কিন হামলায় নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইস্পাহানের প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে জাতিসংঘ পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা (আইএইএ) এখনও ইরানের ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার (৬০ শতাংশ) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো হদিস পায়নি।
সংস্থাটির ধারণা, এই মজুদের অর্ধেকটাই ইস্পাহানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের একটি দুর্ভেদ্য ভূগর্ভস্থ টানেলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবে ওই কেন্দ্রে পরিদর্শন কার্যক্রম স্থগিত থাকায় বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
আইএইএ-র মতে, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
গত জুনের সামরিক অভিযান এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক যুদ্ধের যোগসূত্র টেনে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। আর সেই সাফল্যকে ভিত্তি করেই শুরু হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, যা ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এক সময় এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা পরমাণু অস্ত্রের পথে এগোচ্ছিল।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘকাল ধরেই একটি বিষয়ে স্পষ্ট, ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র হাতে পাবে না। আর তিনি কোনো ফাঁকা বুলি আওড়ান না।”
তবে, এ নিয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স পরিচালকের দপ্তর।
একই সুরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। এটাই এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য।”
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক এরিক ব্রুয়ার মনে করেন, সাম্প্রতিক হামলায় পরমাণু কেন্দ্রগুলো গুরুত্ব না পাওয়ায় ইরানের সক্ষমতার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, “ইরান তাদের পারমাণবিক উপদান মাটির এত গভীরে লুকিয়ে রেখেছে যে সাধারণ বোমা দিয়ে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।”
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ‘গ্রাউন্ড রেইড’ বা সরাসরি স্থল অভিযানের কথা ভাবছেন। ইস্পাহানের ভূগর্ভস্থ টানেল থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার বা ধ্বংস করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সামরিক হামলার পাশাপাশি ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যার ঘটনা তেহরানকে চাপে ফেলেছে।
জাতিসংঘের সাবেক পরমাণু পরিদর্শক এবং ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ডেভিড অলব্রাইট মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলো তেহরানের জন্য বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে তারা যদি শেষ পর্যন্ত কোনো পারমাণবিক বোমা তৈরিও করে, তবে সেটি আদতে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অলব্রাইট বলেন, “আমি মনে করি সবাই একমত যে অর্জিত জ্ঞানকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু কারিগরি দক্ষতা অবশ্যই ধ্বংস করা সম্ভব।”