চাঁদপুরে লোড শেডিং: শহরে কম হলেও গ্রামে দুর্ভোগ চরমে
জেলার আট উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৮ লাখ গ্রাহকের চাহিদা পূরণে প্রয়োজন প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, কিন্তু মিলছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম।
তীব্র গরমে যখন বিদ্যুৎ মানুষের স্বস্তির একমাত্র ভরসা, তখন চাঁদপুরের গ্রামাঞ্চলে সেই বিদ্যুৎ যেন দুর্লভ হয়ে উঠেছে। জেলার আটটি উপজেলায় দিনের বড় একটি সময় কাটছে বিদ্যুৎহীন অবস্থায়। এতে শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
একই সময়ে চাঁদপুর শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক থাকায় শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগও উঠেছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাইমচর, মতলব উত্তর, ফরিদগঞ্জ ও কচুয়ায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এসব এলাকায় একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা, অনেক সময় তারও বেশি অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
দিনের পাশাপাশি রাতেও একই চিত্র। অসহনীয় গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটছে অসংখ্য পরিবারের।
পল্লী বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ের প্রেক্ষাপটের বর্ণনা দিতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন।
ভুক্তভোগী ওই বাসিন্দা বলেন, “মঙ্গলবার রাত ১০টায় বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে রাত ১১টায়। রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকলেও আবার রাত ১টায় বিদ্যুৎ চলে যায়। আসে ফের আসে রাত ২টায়। পরদিন বুধবার ভোর ৬টায় আবার বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে সকাল ৮টায়। এরপর ৯টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যায়।
“এভাবে এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন লোডশেডিংয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।”
এভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কোথাও ৮ ঘণ্টা, কোথাও ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
লোড শেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। কিন্তু তার আগের রাতেও বিদ্যুতের অভাবে ভুগতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের।
সদর উপজেলার কল্যাণপুর ইউনিয়নের দাসদী এলাকার ব্যবসায়ী মো. ওহাব খান বলেন, “লোড শেডিংয়ের কারণে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা চরম ব্যাহত হচ্ছে। তারা টানা দুই ঘণ্টাও পড়ার টেবিলে বসতে পারছে না। এছাড়া ডাক্তার দেখাতে গিয়ে সময়মতো পরীক্ষার রিপোর্টও পাওয়া যাচ্ছে না।”
একই উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নের কালিভাংতি এলাকার বাসিন্দা দুলাল শেখ বলেন, “দিন-রাত সমানভাবে লোড শেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি কৃষিরও ক্ষতি হচ্ছে।”
ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা এলাকার কৃষক মো. হারুন বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না। জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রাতেও বিদ্যুৎ থাকে না, গরমে ঘুমানো যায় না।”
হাইমচর উপজেলার আলগী এলাকার বাসিন্দা জাহিদ হাসান বলেন, “শুধু গৃহস্থালি নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ফ্রিজে রাখা মাছ, মাংস, দুধসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য নষ্ট হয়ে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।”
হাজীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, “লোড শেডিং এখন শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কমছে, ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।”
সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নের পাইকাস্তা এলাকার বাসিন্দা মো. নান্নু মাল বলেন, “নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছি। তারপরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। মানুষ চরম ভোগান্তিতে আছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান হওয়া প্রয়োজন।”
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্র জানায়, জেলার আট উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৮ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। তাদের চাহিদা পূরণে প্রয়োজন প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তবে তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে জেলায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোড শেডিং করতে হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “জ্বালানি সংকট এবং দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।”
তবে গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে গ্রামাঞ্চলে অতিরিক্ত লোড শেডিং করা হচ্ছে। এতে একই জেলার শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা বলেন, “বিদ্যুৎ সংকটের ন্যায্য ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে। কৃষি উৎপাদন, শিক্ষাব্যবস্থা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”
চাঁদপুর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান ভূঞা বলেন, “চাঁদপুর শহরে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ৩১ মেগাওয়াট। গত সপ্তাহে ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় কিছু লোডশেডিং হয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহে সেই ঘাটতি নেই।”
