Published : 05 Apr 2026, 09:58 PM
ইরান যুদ্ধ চলার মধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্মুক্ত উৎসের তথ্য (ওপেন সোর্স ডেটা) ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজরদারি করছে এবং এ সংক্রান্ত তথ্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে।
এমনই খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’। বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে শুরু হওয়া এই নজরদারির ঝুঁকি নিয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের বেসরকারি খাতের বেশ কিছু সংখ্যক কোম্পানি এমন গোয়েন্দা সরঞ্জাম বাজারজাত করছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর গতিবিধি ‘প্রকাশ’ করে দিতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
চীন সরকার প্রকাশ্যে ইরানে সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখার মধ্যেই ঘটছে এমন ঘটনা। চীনের কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে স্যাটেলাইট ছবি, ফ্লাইট ট্র্যাকার এবং জাহাজ চলাচলের তথ্যসহ উন্মুক্ত ডেটা একত্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েনের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তৈরি করছে।
পাঁচ সপ্তাহ আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রবণতা দ্রুত গতি পেয়েছে। চীনা কোম্পানিগুলো মার্কিন বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কিত তথ্য বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করছে কিংবা অনলাইনে প্রকাশ করে দিচ্ছে।
অনলাইনে এমন সব পোস্ট ছড়িয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীর গতিবিধি, যুদ্ধবিমানের অবস্থান এবং সামরিক ঘাঁটির কার্যক্রমের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তথ্যও উঠে এসেছে। এই খাতে জড়িত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনের সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এগুলো চীনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যেখানে বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে।
এই ‘সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন’ কৌশলে রাষ্ট্রও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ করছে। এই হুমকি কতটা গুরুতর, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এসব সরঞ্জাম প্রতিপক্ষরা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছে কি না। আবার অন্যরা সতর্ক করছেন, সরঞ্জামগুলো যতটা অত্যাধুনিক হয়ে উঠছে, তাতে ভবিষ্যতে কোনও সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেনা চলাচল গোপন রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘মিজারভিশন’ এবং ‘জিং’আন টেকনোলজি’র মতো চীনা কোম্পানিগুলো দাবি করছে যে, তাদের এআই প্রযুক্তি মার্কিন বাহিনীর অত্যন্ত গোপন গতিবিধিও শনাক্ত করতে সক্ষম।
এসব কোম্পানি এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী, বি-২এ স্পিরিট স্টিলথ বোমারু বিমান এবং সৌদি আরব ও কাতারের ঘাঁটিতে থাকা যুদ্ধবিমানের অবস্থান নিয়ে বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রণতরীর জ্বালানি সরবরাহের ধরন বিশ্লেষণ করে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের পূর্বাভাস দেওয়ার দাবিও করেছে।
একটি চীনা কোম্পানি দাবি করেছে, তারা পশ্চিমা ও চীনা তথ্যসূত্রের মিশ্রণ এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করে রিয়েল-টাইমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম নজরদারি করতে পারে।
আরেকটি কোম্পানি বলেছে, তারা যুদ্ধবিমানের যোগাযোগ বিশ্লেষণ এবং বড় ধরনের সামরিক চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর সাবেক কর্মকর্তা ডেনিস ওয়াইল্ডার মনে করেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতা অতিরঞ্জিত করে দেখাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।
তারা আশঙ্কা করছেন, চীনের বাণিজ্যিক প্রযুক্তি এখন সামরিক নজরদারির অস্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের চীন বিষয়ক কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “চায়না কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-কে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি সরঞ্জামে পরিণত করছে।”
অন্যদিকে, চীন সরকার প্রকাশ্যে কৌশলগতভাবে ইরান সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। চীন যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। তারা সরাসরি জড়িত হওয়া এড়িয়ে চললেও তাদের বেসরকারি খাত এই যুদ্ধকে কাজে লাগাচ্ছে।
ইরানে যুদ্ধ চলার মধ্যে চীনের প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা সহায়তা এই যুদ্ধের ময়দানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন, প্রতিপক্ষরা ইরানকে কিছু গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে।
চীনের বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো এক ধরনের কৌশলগত সুবিধা সৃষ্টি করছে, যেখানে চীন সরকার সরাসরি জড়িত না থেকেও এসব তথ্য ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়োজনে দায় এড়াতে পারে।