Published : 16 Jul 2026, 10:27 PM
মহাকাশে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতির মধ্যেই বড় ধাক্কা খেয়েছে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। গত কয়েকমাসে একের পর এক পদত্যাগ করেছেন ইসরোর ১০০ জনের বেশি বিজ্ঞানী। লাগাম টানতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় মহাকাশ বিভাগ।
বিজ্ঞানীদের গণপদত্যাগ ও আগাম অবসর ঠেকাতে চাকরি ছাড়ার নিয়ম কঠোর করেছে ভারতের মহাকাশ বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব স্পেস বা ডিওএস)। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, ১৪ জুলাই ইসরোর প্রধান গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে এই সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে।
মূলত বেঙ্গালুরুর ইউআরএসসি এবং তিরুঅনন্তপুরমের ভিএসএসসির মতো বড় ইসরো সেন্টারগুলোতে বিজ্ঞানীদের চাকরি ছাড়ার হিড়িক লক্ষ্য করার পরই এই কড়াকড়ি শুরু হল।
এনডিটিভি-র হাতে আসা ওই সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, গগনযানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে যুক্ত গ্রুপ 'এ' শ্রেণির বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি কর্মীরা চাইলেই এখন আর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পদত্যাগ বা স্বেচ্ছায় অবসর নিতে পারবেন না। কারণ, এই প্রবণতা জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী বা তার নিচের পদের কোনও কর্মী চাকরি ছাড়তে চাইলে সেই আবেদন সরাসরি কেন্দ্রের পরিচালকদের সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মহাকাশ বিভাগে পাঠাতে হবে।
এতদিন ইসরোর বিভিন্ন সেন্টারের পরিচালকরাই বিজ্ঞানীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে পারতেন। নতুন নির্দেশিকায় তাদের সেই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কোনও বিজ্ঞানী পদত্যাগ করতে চাইলে এ বিষয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের কেন্দ্রীয় মহাকাশ বিভাগ (ডিওএস)।
ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার (ইউআরএসসি) ও বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার (ভিএসএসসি) ছাড়াও সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার (এসডিএসসি) এবং লিকুইড প্রপালশন সিস্টেম সেন্টারসহ (এলপিএসসি) বেশ কয়েকটি ইসরো সেন্টারে ইতোমধ্যে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার’ প্রতিবেদন বলছে, গত কয়েক মাসে ১০০ থেকে ১২০ জন বিজ্ঞানী ইসরো ছেড়েছেন। ৮০ জন পদত্যাগ করেছেন বেঙ্গালুরুর ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার থেকে।
তিরুঅনন্তপুরমের বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার থেকে পদত্যাগ করেছেন ২০ জন বিজ্ঞানী। খাতায় কলমে এই সংখ্যা আরও বেশি। আরও বেশ কয়েকজনের পদত্যাগপত্র জমা পড়েছে। এখনও অব্যাহতি দেওয়া হয়নি তাদের।
পদত্যাগের হিড়িকে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ভিক্টর জোসেফ টি-এর পদত্যাগে। তিনি ভিএসএসসির ‘জিএসএলভি এমকে ৩’ প্রকল্পের প্রজেক্ট পরিচালক ছিলেন।
গগনযান মিশনে ব্যবহার করা হবে এমন একটি রকেট (এলভিএম৩) প্রকল্পের প্রধান হিসেবে মাত্র ১৩ মাস দায়িত্ব পালন করার পর ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি পদত্যাগ করেন।
কিন্তু কেন এই পদত্যাগের হিড়িক তা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি ইসরো বা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ভারতের মহাকাশ গবেষণায় নতুন নতুন বেসরকারি সংস্থা প্রবেশ করছে।
এই সংস্খাগুলো ইসরোর বিজ্ঞানীদের অনেক বেশি বেতনের চাকরি, পদোন্নতি এবং স্বাধীনতা দিতে চাইছে। সম্ভবত এ সবে প্রলুব্ধ হয়ে ইসরো ছাড়ছেন বড় বড় বিজ্ঞানীরা।
পিক্সেল, ধ্রুব স্পেস, স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, অগ্নিকূল কসমস এবং বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেসের মতো কোম্পানিগুলো এখন এই দৌড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। অনেকের মত, বিজ্ঞানীরা চলে যেতে থাকায় গগনযানের মতো অভিযান পিছিয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই এবার হস্তক্ষেপ করেছে ভারতের কেন্দ্র সরকার।
বিজ্ঞানীদের চলে যাওয়ার পাশাপাশি সম্প্রতি বেশ কিছু অভিযানেও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো।
সংস্থাটির অন্যতম প্রধান রকেট ‘পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল’ (পিএসএলভি) এক বছরের মধ্যে পরপর দুটি ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে। জানুয়ারি মাসে ইওএস-এন১ স্যাটেলাইট নিয়ে যাওয়ার সময় ‘পিএসএলভি-সি৬২’ রকেটটি নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।
এর আগে গত বছরের মে মাসে ‘পিএসএলভি-সি৬১’ রকেটটির অভিযান ব্যর্থ হলে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার স্যাটেলাইট ধ্বংস হয়ে যায়।
অবশ্য এই সাময়িক ধাক্কাগুলো কাটিয়ে উঠে ইসরো এখন তাদের আগামী বড় প্রকল্পগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গগনযান মিশন, যার লক্ষ্য ভারতকে বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে স্বাধীনভাবে মহাকাশে মানুষ পাঠানোর গৌরব এনে দেওয়া।
এছাড়া রয়েছে চাঁদের নমুনা সংগ্রহের জন্য ‘চন্দ্রযান-৪’, নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন’ (বিএএস) এবং মঙ্গল গ্রহ অভিযানের জন্য ‘মঙ্গলযান-২’ প্রকল্প।