Published : 17 Jul 2026, 12:41 AM
বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে অগ্রাধিকার পাওয়া শেখ হাসিনা পরিবার ও ১০ শিল্পগোষ্ঠীর মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক শুধু সেই কাজে রাখার নির্দেশ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
দুদকের এসব কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে স্থাপিত যৌথ তদন্ত দলের (জেআইটি) অস্থায়ী কার্যালয়ে বসে কাজ করবেন।
দুদকের মানি লন্ডারিং শাখা থেকে মঙ্গলবার কমিশনের সব মহাপরিচালককে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ৭ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দুদকসহ সংশ্লিষ্ট চার সংস্থাকে একইভাবে কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে।
দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের আওতাধীন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলা সফলভাবে শেষ করতে কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তা সার্বক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কেসের কাজে নিয়োজিত থাকবেন।
তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে স্থাপিত জেআইটির অস্থায়ী কার্যালয় থেকে কাজ পরিচালনা করতেও বলা হয়েছে।
চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) আগের দুটি চিঠির পাশাপাশি ২০২৫ সালের ২২ মে আইএসিসিসির সঙ্গে সই করা ‘প্রটোকল অব কো-অপারেশন’-এর কথা বলা হয়েছে।
আইএসিসিসি বা ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি-করাপশন কোঅর্ডিনেশন সেন্টার বড় ধরনের দুর্নীতির মামলায় বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য ও গোয়েন্দা সহায়তা বিনিময় এবং সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রম সমন্বয় করে।

আলাদা বসার কারণ কী?
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যৌথ দলগুলো গঠনের সময়ই এগুলোকে ‘ডেডিকেটেড টিম’ হিসেবে কাজ করানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। অর্থাৎ, এসব দলের কর্মকর্তারা অন্য কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত না করে শুধু নির্ধারিত অগ্রাধিকার মামলায় কাজ করবেন।
কিন্তু বাস্তবে কোনো কোনো কর্মকর্তার কাছে ১৪টি, ১৫টি, এমনকি ২০টি পর্যন্ত অন্য মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব রয়েছে। ফলে তারা কোনো মামলাতেই প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের তদন্তে এক দিন বিলম্ব হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পদ স্থানান্তর, রূপান্তর কিংবা অন্য কারও নামে সরিয়ে ফেলার সুযোগ পেতে পারে।
সে কারণে দেশের স্বার্থে এসব কর্মকর্তাকে অন্য কাজ থেকে সরিয়ে পুরো সময় অগ্রাধিকার মামলাগুলোতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ১১টি যৌথ দলের জন্য ১১টি আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেখানে কম্পিউটার, প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অন্যান্য লজিস্টিকস সহায়তাও দেওয়া হবে, বলেন ওই কর্মকর্তা।
প্রতিটি দলে দুদকের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা থাকছেন। তবে দলভেদে সদস্যসংখ্যা আলাদা।
দুদকের নেতৃত্বে থাকা এসব দলের কার্যক্রম সমন্বয় করছে বিএফআইইউ।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।
শেখ হাসিনা ও তার সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা মামলা ছাড়াও দুর্নীতি, অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে।
দুদকের তদন্তের আওতায় কারা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং ১০ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আসা অর্থ পাচারের অভিযোগ অগ্রাধিকারভিত্তিতে তদন্ত করছে দুদক।
তদন্তের আওতায় থাকা শিল্প গ্রুপগুলো হল-বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, এস আলম, নাবিল, নাসা, ওরিয়ন, সিকদার, সামিট, প্রিমিয়ার এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরামিট গ্রুপসহ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থপাচার এবং কর ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করে ব্যবসার মালিকানা এবং বাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনায় বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগের কয়েকটিতে ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে।
যৌথ তদন্ত দলের আগের তালিকায় জেমকন গ্রুপের নাম থাকলেও পরে সেটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এইচ বি এম ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপকে যুক্ত করা হয়।
বিএফআইইউর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এর আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, জেমকনকে তদন্তের বাইরে রাখা হয়নি বা ছাড়ও দেওয়া হয়নি। বড় ধরনের অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তখন না পাওয়ায় বিষয়টি যৌথ তদন্তের বদলে দুদকের সাধারণ অনুসন্ধানের আওতায় রাখা হয়েছে।

৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ
গেল ৯ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, শেখ হাসিনার পরিবার ও অগ্রাধিকার পাওয়া ১০ শিল্পগোষ্ঠীর দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালতের আদেশে জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
এর মধ্যে দেশে ৯ হাজার ৯১৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
বিদেশে ১৫ হাজার ১১১ কোটি ৯২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
অর্থপাচার-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় তখন পর্যন্ত ১৪১টি মামলা হওয়ার তথ্য দেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় হয়েছে।
বিদেশে থাকা সম্পদের ওপর আদালতের আদেশ কার্যকর করতে ১৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। আরও প্রায় ১২টি অনুরোধ পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সরকার অর্থপাচারের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীনকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছে।
এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স বা পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি সইয়ে সম্মতি দিয়েছে। অন্য দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের আগে থেকেই এ ধরনের চুক্তি রয়েছে।
বিদেশে পাচার করা সম্পদ উদ্ধারের কাজ ত্বরান্বিত করতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউর অধীনে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন’ গঠন করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা শ্বেতপত্র কমিটির হিসাবে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বাইরে গেছে; বছরে গড়ে যার পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় শিল্পগোষ্ঠী ও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে দুদক, সিআইডি, বিএফআইইউ এবং এনবিআরের বিভিন্ন বিভাগ আলাদাভাবে অনুসন্ধান শুরু করে।
পরে এসব কার্যক্রমকে এক কাঠামোর মধ্যে এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বাধীন আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের সুপারিশে দুদকের নেতৃত্বে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়।