Published : 15 Jul 2026, 11:12 PM
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসেন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে পুলিশ যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে উঠে এসেছে ‘ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী’।
মামলা হওয়ার পর প্রায় নয় মাস তদন্ত করে গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফ হোসেন।
সেখানে জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, তার প্রেমিক মো. মাহির রহমান, মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে আসামি করা হয়েছে।
বুধবার অভিযোগপত্রটি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে উপস্থাপন করা হয়। বিচারক অভিযোগপত্রটি দেখে তা গ্রহণ করার জন্য আগামী ১২ অগাস্ট দিন রেখেছেন।
তদন্তকর্তা এসআই আশরাফ হোসেন বলেন, “অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেছি। তিনজনের প্রেমের দ্বন্দ্বের জেরেই ভিকটিমকে খুন করা হয়েছে।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবায়েদ হোসেন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ছাত্রী বর্ষাকে পড়াতে গিয়ে তিনি খুন হন।
সেদিন বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ওই ছাত্রীর বাসার নিচ তলায় জোবায়েদকে ছুরি মারা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনতলার সিঁড়িতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় তাকে।
ওই ঘটনায় দুইদিন পর জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আশরাফ হোসেন বলেছেন, বর্ষা ও মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মাহির পড়তেন বোরহানউদ্দিন কলেজে। আর বর্ষা ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে।
ঢাকায় পাশাপাশি বাড়িতে বড় হয়ে ওঠা এই দুজন ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে পছন্দ করতেন। একসময় তাদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর গৃহশিক্ষক জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে বলেছেন, “তাদের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল, যার তথ্য মোবাইল ফরেনসিক বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে।”
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পরে মাহিরের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক আবারও জোড়া লাগে। তখন জোবায়েদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অন্তরঙ্গ সময়ের ছবি-ভিডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে তাকে হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেন বর্ষা ও মাহির। জোবায়েদকে কীভাবে ‘সরিয়ে’ দেওয়া যায়, সে পরিকল্পনা তারা করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ‘হত্যা করার সিদ্ধান্ত’ নেন।



তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যার আট থেকে নয় দিন আগে মাহির ও তার বন্ধু আয়লান ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। পরে তারা দুটি ছুরি কেনেন এবং কয়েক দিন ধরে সুযোগের অপেক্ষা করেন।
“বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনিতে যাওয়া-আসার সময় মাহিরকে জানাতেন। ঘটনার দিন ১৯ অক্টোবর বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ বর্ষাকে নিজের লাইভ লোকেশন শেয়ার করেন। সেই লোকেশন পাওয়ার পরই ওঁত পেতে থাকা মাহির ও আয়লান হামলা চালান জোবায়েদের ওপর।”
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “জোবায়েদের ঘাড়ের রগে ১০ ইঞ্চি লম্বা ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।”
জানতে চাইলে মামলার বাদী এনায়েত হোসেন বলেন, “তিন জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ, এতটুকুই জেনেছি। অভিযোগপত্রে ওই তিন আসামি আছে, এটা তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন। আমার পড়ার সুযোগ হয়নি।”
তিনি বলেন, “যেহেতু এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা, বিচারিক প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শুরু ও শেষ হয়, এটাই চাওয়া। দ্রুত বিচার হলে মানুষ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেবে।”
বর্ষার মা আনিকা রহমান বলেন, “আমি আগেও বলেছি, আমার মেয়ে নির্দোষ। এখনও বলছি, আমার মেয়ে নির্দোষ।”
মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন। প্রতিদিনের মত গেল ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নুর বক্স লেনের ১৫ নম্বর বাড়ি রৌশান ভিলায় বর্ষাকে পড়ানোর জন্য যান। বিকাল ৫টা ৪৮ মিনিটের দিকে ওই ছাত্রী জোবায়েদ হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই কামরুল হাসান সৈকতকে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে জানান, ‘জোবায়েদ স্যার খুন হয়ে গেছে, কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলছে’।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কামরুল হাসান সন্ধ্যা ৭টার দিকে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘটনাটি জানান।
এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল রৌশান ভিলায় পৌঁছান। ভবনের নিচতলা থেকে ওপরে ওঠার সময় সিঁড়ি এবং দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। ওই ভবনের তৃতীয় তলার রুমের পূর্ব পার্শ্বে সিঁড়িতে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় দেখতে পান।
এনায়েত হোসেন অভিযোগ করেন, আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে জোনায়েদকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলার ডান পাশে আঘাত করে হত্যা করেছে।
মামলার আসামি বর্ষা, তার প্রেমিক মাহির রহমান, মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান ২১ অক্টোবর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু বলেন, “এটা ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনীর জেরে হত্যাকাণ্ড। এর মাস্টারমাইন্ড বর্ষা। সেই মাহিরকে প্ররোচিত করে জোবায়েদকে হত্যা করে। মাহির ও ফারদীন এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।”

তিনি বলেন, “এটি একটা আলোচিত মামলা। মামলায় সাক্ষীও করা হয়েছে অনেকজনকে। আমরা চাইবো মামলার বিচার যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হয়।”
বর্ষার আইনজীবী নুর মাহবুবুল আলম বলেন, “জোবায়েদ ছাত্রদল করতেন। আর ছাত্রদল বিএনপির একটা অঙ্গসংগঠন। সরকারে এখন বিএনপি। এখন তদন্ত কর্মকর্তা যদি বায়াসড হয়ে অভিযোগপত্র দেন, এটা একটা বিষয়।
“আর তদন্ত কর্মকর্তাকে সাক্ষ্য, জেরায় প্রমাণ করতে হবে তিনি যা তদন্তে পেয়েছেন। যাই হোক এটা বিচারিক বিষয়।”
তিনি বলেন, “বর্ষার মা কিন্তু বলে আসছেন তার মেয়ে নির্দোষ। আমাদের দেশে কিন্তু এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে সত্য ঘটনা মিথ্যায় প্রমাণিত হয়েছে। আবার অনেক মিথ্যা ঘটনা জোর করে সত্য বানানো হয়েছে। এ মামলা প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষী নেই। আসামিদের দুই দিন আটকে রেখে জোর করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। যাই হোক, যেহেতু আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র এসেছে, তাদের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। তারা যেন ন্যায়বিচার পান।”
আগের খবর:
ছাত্রীর প্রেমিকের সন্দেহের বলি ছাত্রদলের জুবায়েদ, ধারণা পুলিশের
জগন্নাথের ছাত্রদল নেতা জুবায়েদ হত্যা: ছাত্রী আটক
ভবনের সিঁড়িতে পড়ে ছিল জগন্নাথের ছাত্রদল নেতার রক্তাক্ত লাশ
জবির জুবায়েদ হত্যা: 'পুরোটাই ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী' বলছে পুলিশ