Published : 19 May 2026, 01:19 AM
“কোরআন থেকেই আমার ধর্মের উৎপত্তি। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি যে, নিজের ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা আমার থাকা উচিত। ধর্ম পালনে নিয়মের কড়াকড়ি সরাসরি আমাদের সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত হানছে,” ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদার বাসিন্দা নাসিম আখতার।
রাজ্য বিধানসভায় নবনির্বাচিত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করায় মুসলিম ক্রেতারা যেমন গরু কিনতে পারছেন না, তেমনি বিপাকে এবং লোকসানের মুখে পড়েছেন রাজ্যের হাজার হাজার হিন্দু গবাদিপশু ব্যবসায়ী ও খামারি। তাদের কন্ঠেও হতাশার সুর।
পশু কোরবনিতে কঠোর শর্তের বেড়াজাল:
কোরবানির ঈদের (ঈদুল আজহা) মাত্র দুই সপ্তাহ আগে রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তর থেকে গবাদিপশু জবাইয়ের নিয়ম কঠোর করে একটি সংশোধিত গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
১৯৫০ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু হত্যা নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে কার্যকরের উদ্দেশ্যে জারি এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দ্বৈত স্বাক্ষরযুক্ত ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বা সুস্থতার সনদ ছাড়া গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর এবং মহিষসহ কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না।
পৌরসভার চেয়ারম্যান কিংবা পঞ্চায়েত সভাপতির সঙ্গে সরকারি পশু চিকিৎসক- ২ জনের যৌথ সার্টিফিকেট থাকলে তবেই গরু, মোষ হত্যায় ছাড় পাওয়া যাবে। সরকারি অনুমতি মেলার পরেই গরু, ষাঁড়, মোষ হত্যা করা যাবে। পশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও সক্ষমতা পরীক্ষা করেই সনদ বা সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।
তবে অনুমোদন মিললেও রাস্তাঘাট বা প্রকাশ্য স্থানে পশু জবাই সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পশু হত্যা করা যাবে শুধুমাত্র সরকার স্বীকৃত কসাইখানায়।
সংশ্লিষ্ট পশুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হতে হবে। পাশাপাশি পশুটি বার্ধক্য, আঘাতপ্রাপ্ত, বিকলাঙ্গ কিনা বা অন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি ও দুরারোগ্য রোগে স্থায়ীভাবে অক্ষম কি না, তাও যাচাই করতে হবে।
নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি এক হাজার রূপি পর্যন্ত জরিমানা অথবা কারাদণ্ড ও জরিমানা- উভয় দণ্ডই হতে পারে।
বলা হয়েছে, ১৯৫০ সালের সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় এ ধরনের অপরাধ আদালতে বিচারযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন বলছে, পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা কমানো এবং আইন মেনে পশু জবাই নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টের প্রাসঙ্গিক রায়ও সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
তবে কোরবানি ঈদের ঠিক আগে আগে জারি করা এই নতুন নিয়ম রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং উৎসব উদযাপনে বড় ধরনের সংকট ও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
সংখ্যালঘু অধিকার কর্মী এবং ‘মাইলস-টু-স্মাইলস’ এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা আসিফ মুজতবা বলেন, “আইনটি নিরপেক্ষ ভাষায় লেখা হলেও কোরবানির ঈদের ঠিক আগে এ ধরনের কঠোর বিধি মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। মেকানাইজড বা আধুনিক অর্থনীতিতে কয়েক দশকের পুরোনো একটি কৃষি আইনের এমন ব্যবহার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
আইনজীবী অর্ক মাইতি এটিকে সুপ্রিম কোর্টের ‘পরোক্ষ বৈষম্যের তত্ত্ব’-র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আপাতদৃষ্টিতে দুধের সরবরাহ ও কৃষি সুরক্ষার কথা বলা হলেও এর পেছনে একটি স্পষ্ট ধর্মীয় সুর রয়েছে।
ইতোমধ্যে কলকাতা পৌরসংস্থা (কেএমসি) টাঙ্গরাসহ পাঁচটি নির্দিষ্ট কসাইখানা চিহ্নিত করেছে এবং লাইসেন্স ও সিল ছাড়া মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। হঠাৎ করে নতুন আইন ঘোষিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।
ক্ষোভ-হতাশা:
পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং বীরভূমের মতো জেলাগুলোতে কোরবানির হাটগুলোতে মূলত হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ীদের গরু কেনাবেচা হয়। প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে তারা কোটি কোটি রূপির ব্যবসা করেন।
কিন্তু এবার আইনি জটিলতা এবং পুলিশের হয়রানির ভয়ে হাটে গরু কিনতে আসছেন না মুসলিমরা। এতে হিন্দু খামারিরা অনেকেই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক হিন্দু খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমরা সারা বছর ধরে কোরবানির বাজার ধরব বলে লাখ লাখ রূপি ধারদেনা করে গরু পালন করি।
“সুস্থ-সবল গরু না হলে কোরবানি হয় না। অথচ সরকার বলছে ১৪ বছরের বুড়ো বা অক্ষম গরু ছাড়া হত্যা করা যাবে না। তাহলে আমাদের এই তরতাজা গরুগুলো কে কিনবে? আমরা এখন ঋণের দায়ে দেউলিয়া হয়ে যাব।”
আরেক ভিডিওতে এক হিন্দু নারীকে বলতে শোনা যায়, “আমি ৫ লাখ টাকা ঋণ করেছি। আমরা তো অনেক আগে থেকে একসঙ্গে আছি। ওদের (মুসলিম) কোরবানিটা ওদের করতে দিন। ওরা গরু না কিনলে আমাদের কী হবে?”
গরুর ‘জন্মসনদ’ নিয়ে শোরগোল:
গরু জবাইয়ে কঠোর নিয়মের এই বেড়াজালের মধ্যে শনিবার পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্রের ‘গরুর জন্মসনদ’ দেখানোর দাবি নিয়ে রাজনীতিতে শোরগোল সৃষ্টি হয়েছে।
হিঙ্গলগঞ্জের লেবুখালি এলাকায় একটি গবাদিপশুবাহী গাড়ি আটকে তিনি দাবি করেছিলেন, গরু পরিবহনের সময় গরুর ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ বা জন্মসনদ দেখাতে হবে। জবাই করার জন্য নিয়ে যাওয়া গরুর সঠিক বয়স প্রমাণ করতে এই জন্মসনদ দেখাতে হবে বলে রেখা দাবি করেন।
বিধায়কের এই মন্তব্যের পরই কড়া কটাক্ষ এসেছে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের কাছ থেকে। দলটির মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেছেন, বিজেপি শাসিত অন্য কোনও রাজ্যে গরুর জন্মসনদ দেওয়া হয় কি না, তা আগে প্রমাণ করুন।
তিনি বলেন, “আমরা মাননীয় বিধায়কের কাছে অনুরোধ করব, বিজেপির শাসনাধীন যেকোনো একটি রাজ্য থেকে গরুর নামে দেওয়া একটি বার্থ সার্টিফিকেট এনে দেখান। বিজেপি যদি সত্যিই গরুর এমন কোনো বার্থ সার্টিফিকেট দেখাতে পারে, তবে আমাদের এও খতিয়ে দেখতে হবে যে, এই সার্টিফিকেট দেওয়ার এখতিয়ার কে দিয়েছে।”