Published : 16 Oct 2022, 08:28 PM
১৯৪৭ সালের ১৪ অক্টোবর শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে ‘বেল এক্স-১ রকেট প্লেন’ উড়িয়ে ইতিহাস গড়েছিল নাসার পূর্বসূরী ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ফর অ্যারোনটিক্স (নাকা); প্লেনটির শব্দের গতি ছাড়িয়ে যাওয়ার বজ্রপাতের মতো আওয়াজে কেঁপে উঠেছিলেন মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা গবেষক আর প্রকৌশলীরা।
৭৫ বছরের ব্যবধানে আবারও ‘সাউন্ড ব্যারিয়ার’ ভাঙ্গার পরিকল্পনা পরিকল্পনা করেছে নাসা। তবে, সংস্থাটি এবার সে অর্জনে পৌঁছাতে চায় কোনো ‘সনিক বুম’ ছাড়াই। আর নাসার এবারের বাজির ঘোড়ার নাম ‘এক্স-৫৯’।

একটি নৌকা পানিতে ভেসে সামনে এগোনোর সময়ে যেমন ঢেউ সৃষ্টি করে, একটি প্লেনও ওড়ার সময়েও বায়ুমণ্ডলে ‘এয়ার-প্রেশার ওয়েভ’ বা বাতাসের চাপের ঢেউ সৃষ্ট করতে থাকে।
কিন্তু প্লেনের গতি যখন শব্দের গতির কাছাকাছি পৌঁছায়, একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে একিভূত হতে থাকে বাতাসের ঢেউগুলো, প্লেনের পথ থেকে সরে যাওয়ার সময় পায় না। এ পরিস্থিতিই ‘সাউন্ড ব্যারিয়ার’ নামে পরিচিত।

আর প্লেন যখন শব্দের চেয়ে বেশি গতি অর্জন করে সেই ঢেউগুলোকে কার্যত ছেদ করে বেরিয়ে যায়, তখন মাটি থেকে যে আওয়াজ শোনা যায়, সেটাই ‘সনিক বুম’।
কিন্তু, এখন এই সনিক বুম ছাড়াই সুপারসনিক বা শব্দের চেয়ে বেশি গতি অর্জনের চেষ্টা করছে নাসা; গবেষকদের আশা, অদূর ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সনিক বুম ছাড়াই সুপারসনিক গতিতে ভ্রমণ করতে পারবেন যাত্রীরা।
এক্স-৫৯
“প্রথম সুপারসনিক ফ্লাইট এক অসাধারণ বড় অর্জন ছিল। সে অবস্থা থেকে আমরা কতো দূরে এসেছি একবার দেখুন শুধু। আমরা এখন যা করছি তা তাদের (এক্স-১ গবেষক ও প্রকৌশলী) সিংহভাগ কাজের চূড়ান্ত পর্যায়,” মন্তব্য করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত নাসার আর্মস্ট্রং ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টার অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ার ক্যাথেরিন বাম।
নাসার ‘লো বুম ফ্লাইট ডেমনস্ট্রেশন’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক বাম; এক্স-৫৯ নকশা ও নির্মাণকাজ করছেন তার দলের সদস্যরাই। নাসার ‘কোয়েস্ট’ প্রকল্পের কেন্দ্রে আছে এই সুপারসনিক প্লেন।
কোয়েস্টের মাধ্যমে নাসা দেখাতে চায় যে ‘সনিক বুম’ ছাড়াই শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে উড়তে পারে এক্স-৫৯।

জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি হওয়ায় ১৯৭৩ সাল থেকেই ভূপৃষ্টের ওপর সুপারসনিক গতিতে অ্যারোপ্লেন ওড়ানো নিষিদ্ধ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু নাসা বলছে, ‘সনিক বুম’ এর বদলে কম আওয়াজের ‘সনিক থাম্প’ সৃষ্টি করবে এক্স-৫৯। সাধারণ মানুষ সেই আওয়াজ আদৌ শুনতে পান কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখতে চায় মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি। মানুষের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে নীতিনির্ধারকদের ভূপৃষ্ঠের ওপর অ্যারোপ্লেনের সর্বোচ্চ গতি নিয়ে নীতিমালা নতুন করে সাজাতে হতে পারেও বলে জানিয়েছে নাসা।
পরিকল্পনা সফল হলে ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক তৈরি হবে এবং সম্ভবত আকাশ ভ্রমণের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হবে বলে আশা করছে নাসা। সকালে লস অ্যাঞ্জেলসে নাস্তা করে শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে দুপুরেই নিউ ইয়র্কে পৌঁছে যাবেন যাত্রী।
একাল-সেকাল
১৯৪৭ সালে চাক ইয়েগার যখন এক্স-১ উড়িয়ে সুপারসনিক গতি অর্জন করেছিলেন, তখন শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে বাণিজ্যিক ভ্রমণের বিষয়টি হয়তো তার ভাবনাতেই ছিল না।
তারও দেড় দশক পড়ে, ১৯৬৩ সালের জুন মাসে ‘ইউএস সুপারসনিক ট্রান্সপোর্ট’ বা ‘এসএসটি’ প্রস্তাব তোলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তার কিছু দিন আগেই কনকর্ড নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল ইউরোপ; ১৯৭৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যিক এয়ারলাইনার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সুপারসনিক প্লেনটির বহর।
কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র এসএসটি প্রকল্প স্থগিত করেছে ১৯৭১ সালে, আর ভূপৃষ্ঠের ওপর সুপারসনিক ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছে ১৯৭৩ সালে।
কিন্তু তারপরেও সুপারসনিক ফ্লাইট নিয়ে গবেষণা থামায়নি নাসা। সামরিক ও বৈজ্ঞানিক প্রয়োজনে এক্স-১ এর উত্তরসূরীদের নিয়ে এগিয়ে গেছেন গবেষকরা।
‘সনিক বুম’ যখন নিয়ন্ত্রণে
টানা ৭৫ বছরের ব্যবধানে অ্যারোপ্লেন কেন ও কীভাবে সনিক বুম সৃষ্টি করে সে বিষয়ে আরও বেশি জেনেছেন গবেষকরা। এক পর্যায়ে অ্যারোপ্লেনের আকার বদলে সনিক বুমের তীব্রতা কমানোর ভাবনার দিকে ঝুকেছেন তারা।

২০০৩-২০০৪ সালে ‘সনিক বুম ডেমনস্ট্রেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে সে ভাবনা নিয়ে পরীক্ষাও চালিয়েছেন গবেষকরা। সেবার নর্থথ্রপ এফ৫ই জেটপ্লেনের মূল কাঠামো সংস্কার করে সনিক বুমের তীব্রতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন তারা।
কিন্তু এক্স-৫৯ নকশাই করা হয়েছে সনিক বুমের তীব্রতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে। এক্স-১ প্রমাণ করেছিল, শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছোটা সম্ভব একটি অ্যারোপ্লেনের পক্ষে। শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে ওড়ার সেই সক্ষমতাকে এখন সর্বসাধারণের ব্যবহার উপযোগী করতে চায় নাসা।
“গত ৫০ বছর ধরে আমাদের এয়ারলাইনারগুলো মাক ০.৮-এ আটকে আছে। তাই আরও দ্রুতগতিতে ভিন্ন কোথাও যাওয়ার স্বপ্নটা যেন অপূর্ণই রয়ে গেছে,” বলেছেন নাসার কোয়েস্ট প্রকল্পের মিশন সমন্বয় ব্যবস্থাপক পিটার কোয়েন।
“আমার মনে হয় কোয়েস্ট মিশনে এক্স-৫৪৯ ওড়ানোর মাধ্যমে আমরা আবারও সাউন্ড ব্যারিয়ার ভাঙ্গতে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি।”
২০২৩ সালের শুরুতেই প্রথমবারের মতো এক্স-৫৯ ওড়ানোর পরিকল্পনা করে রেখেছে নাসা।