০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা, আম্বানিকে কেন দুষছেন মাস্ক?

“আম্বানিই কি তাহলে ভারতের আসল বস,” এমন প্রশ্নও তুলেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।

ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা, আম্বানিকে কেন দুষছেন মাস্ক?

মুকেশ আম্বানি ও ইলন মাস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Oct 2026, 05:03 PM

Updated : 09 Oct 2026, 05:14 PM

ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে বড় ধরনের জটিলতায় পড়েছে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কোম্পানি স্টারলিংক।

চূড়ান্ত অনুমোদন ঝুলে যাওয়ার মতো এ জটিলতার জন্য তিনি সরাসরি আঙুল তুলেছেন ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির দিকে।

ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানিই ‘ভারতের আসল বস’ কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন মাস্ক।

মাস্ক অবশ্য শুরুতে সরাসরি কারো নাম না নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, ভারতের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও শক্তিশালী মহল স্টারলিংকের পথ আটকে রাখতে চাচ্ছে।

এ অভিযোগ তোলার একদিন পরই মাস্ক সরাসরি আম্বানির নাম উল্লেখ করেছেন, যার ‘রিলায়েন্স গ্রুপ’ ভারতের অন্যতম বড় মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর ‘জিও’র মালিক।

ভারত মাস্কের এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের বাজারে ব্যবসার নিয়মকানুন পুরোপুরি ন্যায্য ও বৈষম্যহীন।

বিবিসি লিখেছে, তারা মাস্কের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য অনুরাধ জানালেও আম্বানি বা রিলায়েন্স গ্রুপ তাতে সাড়া দেয়নি।

কোনো কোনো বাজার বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। কারণ, রিলায়েন্স জিও ও ভারতী এয়ারটেলও তাদের সেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জটিল হয়ে ওঠে আম্বানির রিলায়েন্স জিও ও ভারতী এয়ারটেলের সঙ্গে স্টারলিংকের অংশীদারত্বের কারণে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে উভয় কোম্পানিই ভারতে স্টারলিংকের সরঞ্জাম ও সেবা বিতরণের জন্য স্পেসএক্সের সঙ্গে সরকারি অনুমোদন নিয়ে চুক্তি সই করে।

কোম্পানিগুলো বলেছিল, তারা নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে।

ভারতের বাজারে প্রবেশে বাধা পাওয়ার অভিযোগ বুধবার প্রথম সামনে আনেন মাস্ক। তিনি ‘নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি’ ভারতীয় গ্রাহকদের ওপর ‘একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ’ ধরে রেখেছে বলে মন্তব্য করেন।

সেদিন মাস্ক এক্স পোস্টে লেখেন, “আপনারাই অনুমান করতে পারেন তারা কারা?”

স্টারলিংককে বাধা দেওয়া মানে ‘ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে অন্যায় করা’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর জবাবে পরের দিন বৃহস্পতিবার ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রলণালয় বলেছে, স্টারলিংক, ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব ও জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস এ তিনটি অপারেটরই অনুমোদনের প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্যিক সেবা চালুর আগে তিন কোম্পানিকেই নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও স্পেকট্রাম বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকতে হবে।

মন্ত্রণালয় সরাসরি মাস্কের নাম তুলে না ধরে বলেছে, “নীতিমালা বা এর প্রয়োগ অন্যায় বা বৈষম্যমূলক এমন ধারণা ভিত্তিহীন ও ভুল।”

মন্ত্রণালয়ের এমন বক্তব্যের পরেও মাস্ক তার অভিযোগের বিষয়ে অটল থাকেন।

বৃহস্পতিবার এক্স পোস্টে মাস্ক লেখেন, “স্টারলিংক ১৬৫টির বেশি দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও ভারতের সরকারের প্রতিটি একক আইন ও শর্ত মেনে চলতে পাঁচ বছর ব্যয় করেছে। তাহলে কেন এখনও লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না? আম্বানি কি ভারতের আসল বস?”

মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের মালিকানাধীন স্টারলিংক পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়, বিশেষ করে এমন সব দূরবর্তী অঞ্চলে, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ড কেবল বসানো কঠিন বা ব্যয়বহুল।

কোম্পানিটি ২০২১ সাল থেকে ভারতে প্রবেশ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এরইমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্সও পেয়েছে। তবে বাণিজ্যিক সেবা শুরুর আগে তাদের এখনও চূড়ান্ত নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও স্পেকট্রাম বরাদ্দ পাওয়া বাকি রয়েছে।

বুধবার বিতর্ক শুরুর সময় স্টারলিংক, রিলায়েন্স জিও ও ভারতী এয়ারটেলের শীর্ষ নির্বাহীরা দিল্লির ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেসে একত্র হয়েছিলেন, সেখানে তিনটি কোম্পানিই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে।

অনুষ্ঠানে ‘রিলায়েন্স জিও ইনফোকম’-এর চেয়ারম্যান ও মুকেশ আম্বানির ছেলে আকাশ আম্বানি বলেছেন, কোম্পানিটি তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তি তৈরি করছে ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

মাস্কের অভিযোগ সম্পর্কে আকাশ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি কেবল বলেছেন, “আমরা কাজে মন দিতে ও আমাদের ভারতীয় গ্রাহকদের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই।”

ভারতী এয়ারটেলের চেয়ারম্যান সুনীল ভারতী মিত্তাল বলেছেন, তাদের কোম্পানির স্যাটেলাইট উদ্যোগও সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

স্টারলিংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের দেখভাল করা স্পেসএক্সের নির্বাহী লরেন ড্রেয়ার বলেছেন, কোম্পানিটি ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে কাজ করেছে। পাশাপাশি দেশের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে নিজেদের নেটওয়ার্কে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা একটি অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালে ভারত কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তারা দূরবর্তী আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে একটি মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযান ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে সেনা অভিযান চালানোর সময় স্টারলিংকের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে।

ওই সময় মাস্ক বলেছিলেন, স্টারলিংকের সেবা ভারতে কখনও চালু ছিল না। কর্তৃপক্ষ যেসব সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে, তা তাদের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছিল না।

গ্রামীণ এলাকার ভারতীয় গ্রাহকদের জন্য এই সেবার খরচ কেমন হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইন্টারনেট বাজার হলেও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সব জায়গায় সমান নয়, বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ড ক্যাবল স্থাপন করা কঠিন বা ব্যয়বহুল।

মাস্ক লিখেছেন, স্টারলিংক এই ব্যবধান দূর করতে পারে।

“ভারতে স্টারলিংক চালু হলে এমন সব মানুষ উচ্চ গতির ও সাশ্রয়ীদামে ইন্টারনেট সংযোগ পাবে যারা বর্তমান দাম বহন করতে পারে না বা যাদের কোনো ইন্টারনেট সংযোগই নেই!”

কোম্পানিটি এখনও ভারতে তাদের সেবার মূল্য ঘোষণা করেনি। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, অন্যান্য দেশের পরিকল্পনা দেখলে মনে হয় এই সেবা অনেক ভারতীয় পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে স্টারলিংকের আবাসিক প্ল্যানগুলোর দাম প্রতি মাসে ৫৫ ডলার থেকে শুরু হয়। তবে বিভিন্ন প্ল্যান ও অবস্থানভেদে দাম ও সরঞ্জামের খরচ ভিন্ন হয়ে থাকে।