Published : 25 Apr 2026, 10:24 AM
অ্যাপলের নেতৃত্বে আসছে বড় পরিবর্তন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিদায় নিচ্ছেন টিম কুক এবং নতুন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেবেন জন টার্নাস।
দায়িত্ব নিয়েই তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে, যেখানে বর্তমান প্রযুক্তি বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দৌড়ে অ্যাপলকে সবার চেয়ে এগিয়ে নেওয়ার ভার বর্তাবে তার ওপরই।
স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবহারকারী সবার নজর এখন টার্নাসের নতুন কৌশলের দিকেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
এআইয়ের জোয়ারে সরাসরি যোগ না দিয়েও অ্যাপল তাদের চার ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য ধরে রাখতে পেরেছে। তবে বিনিয়োগকারীরা সারাজীবন ধৈর্য ধরবেন না। তারা এখন নতুন সিইও জন টার্নাসের দিকে তাকিয়ে আছেন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এআই বাজারে অ্যাপলের কৌশল ঠিক কী হবে দেখার জন্য।
সোমবার অ্যাপল ঘোষণা করেছে, দীর্ঘ ১৫ বছর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর সেপ্টেম্বরে বিদায় নেওয়া কুকের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন অ্যাপলের দীর্ঘদিনের হার্ডওয়্যার প্রধান জন টার্নাস। ক্যান্সারে আক্রান্ত স্টিভ জবসের ২০১১ সালে জীবনাসানের পর টার্নাস হতে যাচ্ছেন অ্যাপলের দ্বিতীয় সিইও।
তবে কুকের বিদায়বেলায় অ্যাপল বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যার মধ্যে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তৈরি জটিল সরবরাহ ব্যবস্থা ও এআই প্রযুক্তির প্রসারের ফলে মেমোরি চিপের আকাশচুম্বী দাম।
এক্ষেত্রে জন টার্নাসের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অ্যাপলকে এআইয়ের দৌড়ে এগিয়ে নেওয়া, যেখানে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তুলনায় অ্যাপল এখনও পিছিয়ে আছে।
এখনপর্যন্ত অ্যাপলের কৌশল ছিল এআই খাতে বড় অঙ্কের খরচ এড়িয়ে চলা। যেখানে মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন ও মেটার মতো কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার তৈরি ও দামী এআই চিপ কেনার পেছনে বছরে কয়েকশ কোটি ডলার খরচ করছে, সেখানে অ্যাপলের তেমন বড় কোনো বিনিয়োগ নেই।
নিজস্ব এআই মডেল তৈরির ক্ষেত্রেও কিছুটা পিছিয়ে আছে অ্যাপল। তাদের এআই ফিচারগুলোর জন্য গুগলের জেমিনাইয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর মাধ্যমে বছরের শেষ দিকে সিরি’তে বড় আপডেট আসার কথা রয়েছে, যা আগেও পিছিয়েছিল।
২০২৪ সালে ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’ আনে অ্যাপল, যার মধ্যে ইমেজ জেনারেটর, টেক্সট রিরাইটার, নোটিফিকেশন সামারি এবং ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। এতে গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র হলেও আইফোনের বিক্রি কমেনি।
আইফোন ব্যবহারকারীরা এসব ডিভাইসে এআই ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন ঠিকই। তবে সেগুলো অ্যাপলের বদলে অন্য কোম্পানির।
বর্তমানে আইফোনের অ্যাপ স্টোরে ফ্রি অ্যাপগুলোর মধ্যে সবার শীর্ষে আছে চ্যাটজিপিটি ও অ্যানথ্রপিকের এআই চ্যাটবট ক্লড। গুগলের জেমিনাই আছে চতুর্থ এবং মেটা এআই অষ্টম স্থানে।
এদিকে, অ্যাপল বাজি ধরছে ভবিষ্যতের ওপর। তাদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এআইয়ের ভারী বিভিন্ন কাজ ফোনের ভেতরের চিপেই সম্পন্ন হবে। এটি অ্যাপলের জন্য বড় সুযোগ, কারণ তারা ২০১৭ সাল থেকেই কোম্পানিটির ডিভাইসে এআই সক্ষমতাওয়ালা চিপ যোগ করে আসছে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ নটর ডেম’-এর ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক টিমোথি হাবার্ড বলেছেন, “জন টার্নাসের মতো একজন হার্ডওয়্যার প্রধানকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে অ্যাপল সম্ভবত এই বার্তাই দিচ্ছে যে, এআইয়ের ভবিষ্যৎ কেবল সফটওয়্যারে নয়, বরং হার্ডওয়্যারের সঙ্গে এর নিবিড় সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল।”
আপাতত আইফোন বিক্রি থেকে অ্যাপলের আয় ভালোই বাড়ছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে আইফোন থেকে আয় আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ৫৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
কোম্পানিটি বলেছে, গত সেপ্টেম্বরে বাজারে আসা আইফোন ১৭ মডেলের ব্যাপক চাহিদাই এই সাফল্যের মূল কারণ। ওই সময় আইফোনের এ চাহিদাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে বর্ণনা করেছিলেন কুক। আগামী সপ্তাহে অ্যাপল তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় কুক সিইও পদে থাকলেও সব বিনিয়োগকারীর নজর থাকবে জন টার্নাসেরর দিকে। তারা জানতে চাইবেন তার নেতৃত্বে অ্যাপল ভবিষ্যতে কোন দিকে এগোবে।
এআইচালিত হার্ডওয়্যারের দিকেই এখন বাজারের ঝোঁক বাড়ছে, তা সে পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, রোবোটিক্স, স্পেশাল কম্পিউটিং বা অ্যাপলের গোপন কোনো প্রকল্প, যাই হোক না কেন।
জানুয়ারিতে মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ব্লুমবার্গ বলেছে, অ্যাপল সিরিভিত্তিক তিনটি নতুন এআই ডিভাইসের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। যেমন, স্মার্ট চশমা, পেনডেন্ট ও ক্যামেরাওয়ালা এয়ারপডস।
এ ছাড়া অ্যাপল ফোল্ডএবল বা ভাঁজ করা যায় এমন ফোন আনার পরিকল্পনাও করছে। ‘ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিস’-এর সিইও বেন বাজারিন বিষয়টিকে ‘গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হার্ডওয়্যার উদ্ভাবন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বাজারিন বলেছেন, তার মতে, “সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আইফোনের পরবর্তী চমক কী হতে যাচ্ছে? আইফোনের বাজার এখন অনেকটা স্থিতিশীল পর্যায়ে চলে এসেছে। ফলে এর পরে কী আসবে তা আমরা নিশ্চিত না জানলেও এটুকু জানি, তা অবশ্যই কোনো না কোনো ধরনের ‘এআই হার্ডওয়্যার’ হবে।”

এআই ও পরিষেবা
৫০ বছর বয়সী টার্নাসকে অ্যাপলের ‘সার্ভিস’ বা পরিষেবা বিভাগেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। অ্যাপলের এ বিভাগটি আইফোন ব্যবহারকারীদের ‘অ্যাপলকেয়ার’, ‘আইক্লাউড’, ‘অ্যাপল টিভি প্লাস’ ও ‘অ্যাপল পে’ এর মতো সাবস্ক্রিপশন বা পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে গ্রাহকরা চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো বিভিন্ন এআই চ্যাটবটের প্রিমিয়াম সংস্করণ ব্যবহার করছেন, এখান থেকেও আয়ের একটি অংশ পায় অ্যাপল।
‘ফরেস্টার’-এর বিশ্লেষক দিপাঞ্জন চ্যাটার্জি বলেছেন, সামনের বছরগুলোতে অ্যাপলের পথ চলা বেশ কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই আসার পর থেকে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের অভ্যাসে আমূল পরিবর্তন এসেছে।
টার্নাসকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, অ্যাপল কি আগের মতোই ‘প্রাইভেসি’র ওপর জোর দেবে নাকি এআইচালিত ‘পার্সোনালাইজেশন’ বা ব্যক্তিগত পছন্দের প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকবে।
বিদায়ী সিইও কুকের আমলে অ্যাপলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যবহারকারীর তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ বিষয়টিই মেটা বা গুগলের মতো কোম্পানিগুলো থেকে অ্যাপলকে আলাদা করেছিল। কারণ, মেটা ও গুগলের মতো কোম্পানি ব্যবহারকারীদের পছন্দ অনুসারে বিজ্ঞাপন দেখানোর কাজ করে।
‘ডিপওয়াটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর জিন মানস্টার বলেছেন, তাদের কোম্পানি সম্প্রতি অ্যাপলের আরও শেয়ার কিনেছে। কারণ তারা মনে করছে ‘পার্সোনালাইজড এআই’ বা ব্যক্তিগত কাজে সহায়ক এআইয়ের ক্ষেত্রে অ্যাপলের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল।
“বিনিয়োগকারীদের কাছে অ্যাপলের প্রমাণ করার একটি দারুণ সুযোগ রয়েছে যে, কোম্পানিটি পার্সোনালাইজড এআই বেশ ভালোভাবেই আয়ত্ত করতে যাচ্ছে।”
সিইও পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হলেও সেখানে এআই সম্পর্কে একটি শব্দও উল্লেখ করেনি অ্যাপল, বরং জন টার্নাস সম্পর্কে অ্যাপল কোম্পানিতে তার ২৫ বছরের অভিজ্ঞতার কথায় বলেছে।
আইপ্যাড, এয়ারপডস এবং আইফোন, ম্যাক ও অ্যাপল ওয়াচের বিভিন্ন প্রজন্মের পণ্য বাজারে আনার ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে বিষয়টি স্পষ্ট আগামী চার মাসের কিছু বেশি সময় পর যখন টার্নাস যুগ শুরু হবে তখন এআইকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।
অধ্যাপক হাবার্ড বলেছেন, অন্তত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে অ্যাপলকে এখন তাদের শেকড়ে ফিরে যেতে হবে।
“দ্রুত উদ্ভাবনের সক্ষমতা অ্যাপলকে আজকের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। অ্যাপলের শুরুটাই হয়েছিল এভাবে, আর সম্ভবত কোম্পানিটিকে আবারও সেই উদ্ভাবনী ধারায় ফিরে যেতে হবে।”