Published : 10 Apr 2026, 11:54 AM
প্রকৃতির বিস্ময়কর রূপের দেখা মিলল কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে, সেখানে হাজার হাজার ছোট মাছকে খাড়া জলপ্রপাত বেয়ে উপরে উঠতে দেখা গেছে। প্রায় ৫০ ফুট উঁচু পিচ্ছিল পাহাড় ও তীব্র স্রোতকে উপেক্ষা করে এসব মাছের মাধ্যাকর্ষণ জয়ের দৃশ্য বিজ্ঞানীদের অবাক করেছে।
রয়টার্স লিখেছে, হাজার হাজার মাছের এমন বিস্ময়কর আচরণে প্রমাণ মেলে, প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রাণীরা কতটা বুদ্ধিদীপ্ত ও বিস্ময়কর কৌশল বেছে নিতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, ‘শেলইয়ার’ প্রজাতির এ মাছের বৈজ্ঞানিক নাম ‘পারাকনেরিয়া থাইসি’। এ প্রজাতির মাছেরা কীভাবে মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকার লুভিলোম্বো জলপ্রপাত বেয়ে উপরে ওঠে এ গবেষণায় তা খতিয়ে দেখেছেন তারা।
কঙ্গোর এ নদী ব্যবস্থাটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেইনফরেস্টের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের শেষে সাধারণত এপ্রিল ও মে মাসে ঋতুভিত্তিক বন্যার সময় এসব মাছ খাড়া পাথুরে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে যায়।
এ প্রজাতির মাছ লম্বায় প্রায় ৯.৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে গবেষকরা বলছেন, কেবল ছোট ও মাঝারি আকারের বিভিন্ন মাছ যেগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৭ থেকে ৪.৮ সেন্টিমিটার এগুলোয় কেবল জলপ্রপাত বেয়ে উপরে ওঠার এ কঠিন যাত্রাটি করছে।
তাদের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, একটি মাছের এ ধীরগতির ও কষ্টকর কাজটি শেষ করে চূড়ায় পৌঁছাতে প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। এরা অল্প অল্প করে এগোয় ও মাঝেমধ্যে দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নেয়। এ প্রজাতির বড় মাছগুলোর দেহের ওজন সম্ভবত বেশি, যা এদের পাখনার পক্ষে বহন করে এই খাড়া দেয়াল বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ‘ইউনভার্সিটি অফ লুবুম্বাশি’র একজন মৎস্যবিজ্ঞানী ও এ গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক প্যাসিফিক কিওয়েলে বলেছেন, “এ আবিষ্কারটি জলাশয় বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, বিশেষ করে কঙ্গো অববাহিকার মতো জায়গায় তা আরও জরুরি, যেখানে মাছের আচরণ নিয়ে গবেষণা নেই বললেই চলে।
“মাছের এমন আচরণ এদের পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে উৎসাহ জুগিয়েছে। কারণ, প্রকৃতিতে যে কোনো কিছুই ঘটা সম্ভব। কাছে গিয়ে সরাসরি না দেখলে এবং ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে প্রমাণ না রাখলে কে বিশ্বাস করত যে কিছু মাছ সত্যিই জলপ্রপাত বেয়ে উপরে উঠতে পারে? প্রকৃতিতে এমন সব বিস্ময় ছড়িয়ে আছে, যা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়।”
গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ।
অন্যান্য কিছু প্রজাতির মাছও বিভিন্ন উপায়ে জলপ্রপাত বেয়ে উপরে উঠতে পারে। তবে গবেষকরা বলছেন, এটিই আফ্রিকায় নথিবদ্ধ হওয়া এ ধরনের প্রথম কোনো প্রজাতির মাছ।
গবেষকরা ২০১৮ ও ২০২০ সালে মোট চারবার এ ‘শেলইয়ার’ মাছের এমন আচরণ রেকর্ড করেছেন। তারা খেয়াল করেছেন, এসব মাছ খাড়া পাথুরে দেয়ালের এমন এক অংশ দিয়ে উপরে উঠছে যেটিকে ‘স্প্ল্যাশ জোন’ বলে। এ এলাকায় সরাসরি পানির তোড় নেই। তবে পানিকণার ঝাপটায় জায়গাটি সবসময় ভেজা থাকে।
মাছেরা কীভাবে পাহাড় বেয়ে ওঠে?
গবেষকরা বলছেন, এসব মাছ এদের বক্ষপাখনা ও শ্রোণীপাখনার সাহায্যে ভেজা পাথরের গায়ে আটকে থাকে। এ কাজে এদের সাহায্য করে দেহের নিচের ছোট ছোট হুকের মতো এক ধরনের আংটা, যা পাথর কামড়ে ধরে রাখতে সহায়ক। এরপর এরা দেহের দুই পাশ দোলাতে দোলাতে বা মোচড় দিয়ে নিজেদের উপরের দিকে ঠেলে দেয়।
মানুষের দেহের আকারের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি হবে কোনো ব্যক্তির শত শত মিটার খাড়া পাহাড়ে ওঠার সমান।

তবে এ কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ। হঠাৎ পানির তীব্র ঝাপটা লাগলে কিছু মাছ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাথর থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যায়, বিশেষ করে যখন এরা পাথরের কোনো ঝুলে থাকা অংশ পার হওয়ার জন্য দেহ উল্টে নেয় তখন।
জলপ্রপাতের পাদদেশে প্রচুর পানি থাকায় যেসব মাছ নিচে পড়ে যায়, তারা সম্ভবত আবারও বেয়ে ওঠা শুরু করতে পারে। তবে গবেষকরা বলছেন, যেসব মাছ সরাসরি পাথরের ওপর আছড়ে পড়ে এদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম থাকে।
এমন আচরণের কারণ কী?
গবেষকরা বলছেন, মাছগুলো সম্ভবত অনুকূল পরিবেশের খোঁজে ও নদীর এমন উজানে পৌঁছাতে চায় যেখানে খাবারের প্রতিযোগিতা এবং শিকারি প্রাণীর ভয়ও কম থাকে।
এ প্রজাতির মাছের জন্য মানুষের তৈরি দুটি প্রধান হুমকির কথা উল্লেখ করেছেন গবেষকরা। প্রথমত, মশারির মতো মিহি জালের ব্যবহার করে অবৈধভাবে মাছ ধরা এবং দ্বিতীয়ত, সেচ কাজের জন্য অতিরিক্ত পানি তুলে নেওয়া, যার ফলে কোনো কোনো বছর লুভিলোম্বো নদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
এ আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয়, কঙ্গো অববাহিকার মাছগুলোর আচরণ সম্পর্কে মানুষ কত কম জানে।
কিওয়েলে বলেছেন, “এমনটি সম্ভব যে, তীব্র স্রোতে বাস করা অন্যান্য প্রজাতির মাছও এভাবেই খাড়া বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে যেতে পারে।”
অন্য মাছের প্রজাতির ক্ষেত্রে পাওয়া প্রাথমিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে গবেষকরা আরও বিস্তারিত পর্যায়ে কাজের পরিকল্পনা করছেন।