Published : 30 Jun 2025, 03:05 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সাধারণত অনেক বেশি কম্পিউটিং শক্তি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি-এ ব্যবহৃত ছোট ছোট যন্ত্র বা সেন্সরের জন্য সমস্যার কারণ হয়।
এ ধরনের বিভিন্ন ডিভাইসের মেমোরি সাধারণত খুব কম ও ব্যাটারিও ছোট। ফলে জটিল বিভিন্ন এআই মডেল সরাসরি চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ‘ই-মাইন্ডস’ নামের নতুন এক গবেষণা প্রকল্প সেই পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে, অর্থাৎ ক্লাউড না থাকলেও সমস্যা নেই। খুব ছোট ছোট ডিভাইসেও এখন চলবে এআই।
‘ইউনিভার্সিটি অফ গ্রাজ’ বা টিইউ গ্রাজ-এর ‘প্রো২ফিউচার’-এর গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন একটি প্রকল্পে এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত উপায় উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা, যার মাধ্যমে বড় কম্পিউটারের সাহায্য ছাড়াই খুব ছোট ডিভাইসেও কার্যকরভাবে এআই চালানো যায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
উদাহরণ হিসেবে, এমন এক ডিভাইসে এআই মডেল চালাতে পেরেছে গবেষক দলটি, যার মেমোরি কেবল চার কিলোবাইট, কোনও সাধারণ টেক্সট ফাইলের চেয়েও কম মেমোরি! এত ছোট মেমোরির পরও ডিভাইসটির ‘লোকেশন ডেটা’ ব্যবহার করে সংকেত বিশ্লেষণ করতে ও কোথা থেকে বাধা আসছে তা নির্ধারণ করতে পেরেছে এআই।
এ প্রযুক্তির মূল রহস্য লুকিয়ে আছে বড় বিভিন্ন এআই মডেলকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ফেলায়। বড় এআই মডেলের অনেক বেশি মেমোরি, শক্তি ও কম্পিউটিং সক্ষমতা লাগে। তবে ছোট ডিভাইসের সেই সক্ষমতার দরকার নেই। ফলে গবেষকরা পুরো বড় মডেলের পরিবর্তে সেটাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করেছেন।
গবেষকরা বলছেন, এখানে প্রতিটি ছোট মডেল একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা সমস্যা নিয়ে কাজ করে। যেমন– একটি মডেল শুধু শব্দ চেনে, আরেকটি মডেল কেবল অবস্থান দেখে এবং আরেকটি মডেল সংকেত বিশ্লেষণ করে। এভাবে একসঙ্গে অনেক ছোট মডেল মিলে কম মেমোরি ও শক্তি ব্যবহার করেও বড় কাজটি সম্পন্ন করে। ফলে ছোট ডিভাইসেও এআই চালানো সম্ভব।
যেমন– একটি এআই মডেল হতে পারে ধাতব দেয়ালের কারণে সৃষ্টি হওয়া বাধা চিহ্নিতের জন্য, আরেকটি মডেল মানুষের কারণে হওয়া বাধা বুঝতে ও আরেকটি মডেল তাক বা শেলফের কারণে হওয়া বাধা শনাক্তের কাজ করে।
গবেষকরা বলছেন, ডিভাইসের একটি কন্ট্রোলার চিপ বুঝতে পারে কী ধরনের বাধা হচ্ছে ও কেবল একশ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে সার্ভার থেকে সঠিক মডেল লোড করে, যা গুদামঘরের মতো জায়গায় ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট দ্রুত।
গবেষকরা আরেকটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘সাবস্পেস কনফিগারেবল নেটওয়ার্ক’। এসব এআই মডেল খুব সহজেই বিভিন্ন ধরনের ডেটার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। মডেলগুলো নিজেকে এমনভাবে সাজিয়ে নেয় যে, এরা যে কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সেটার জন্য সঠিকভাবে কাজ করতে পারে। এমন ফিচার এআই মডেলকে অনেক বেশি নমনীয় ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে।
গবেষকরা বলছেন, এসব মডেল ছোট ও কম শক্তি ব্যবহার করলেও এগুলো প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে দ্রুত কাজ করে। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে বড় কম্পিউটারের সাহায্য লাগে, সেখানে এসব মডেল ৭.৮ গুণ পর্যন্ত দ্রুত কাজ করতে পারে।
এসব এআই মডেলকে আরও ছোট করার জন্য ‘কোয়ান্টাইজেশন’ ও ‘প্রুনিং’ নামের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে গবেষণা দলটি। কোয়ান্টাইজেশন হচ্ছে মডেলের গণিত বা হিসাবকে সহজ করা, অর্থাৎ জটিল সংখ্যার বদলে সহজ সংখ্যার ব্যবহার। এতে করে কম বিদ্যুৎ ও কম মেমোরি ব্যবহার করে কাজ করতে পারে এআই মডেলটি।
অন্যদিকে প্রুনিং হচ্ছে মডেলের এমন বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলা, যা কাজের জন্য দরকার নেই কেবল গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো রাখা হয়। ফলে এআই মডেল ছোট হলেও এর নির্ভুলতা বজায় থাকে।
মডেল ছোট করার পাশাপাশি গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন, এসব মডেল দ্রুত ও কার্যকরভাবে ডিভাইসে লোড করা যায়।
এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য এমন এআই তৈরি করা, যা গুদামঘরের ভেতরে ড্রোন বা বিভিন্ন রোবটকে সঠিক অবস্থান বুঝতে সাহায্য করবে। তবে এ প্রযুক্তি কেবল এই একটি কাজে নয়, বরং আরও অনেক কাজে ব্যবহার করা যাবে বলে দাবি গবেষকদের। যেমন– এমন স্মার্ট গাড়ির চাবি, যা বুঝতে পারবে চাবিটি আসলেই গাড়ির কাছাকাছি আছে কি না ও বাড়ির যন্ত্রপাতি, যা একবার চার্জে বেশি সময় কাজ করবে।
এ প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকা মাইকেল ক্রিসপার বলেছেন, ভবিষ্যতে আরও স্মার্ট ও কার্যকর ডিভাইস তৈরিতে এ প্রকল্পে হার্ডওয়্যার, এআই মডেল অপটিমাইজেশন ও ইনডোর অবস্থান নির্ণয়ের বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে করেছেন ‘ই-মাইন্ডস’ দলের সদস্যরা।