Published : 10 Apr 2026, 10:50 AM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সম্ভাব্য ক্ষতির প্রমাণ বাড়তে থাকায় বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো টিনএজারদের এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ঢালাওভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কোনো কার্যকর সমাধান নয়, বরং সাময়িক এক চেষ্টা।
গেল ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে মেটা’র ইনস্টাগ্রাম, বাইটড্যান্সের টিকটক, অ্যালফাবেটের ইউটিউব, ইলন মাস্কের এক্স ও রেডিটের মতো প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিতে হয়, নয়তো তাদের মোটা অংকের জরিমানা গোনার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ওই পথ অনুসরণ করে এখন যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশ নিজস্ব আইন তৈরির পরিকল্পনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পর্যায়ে এমন নিষেধাজ্ঞা আসার সম্ভাবনা কম থাকলেও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য নিজস্ব আইন প্রণয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসের মূল কোম্পানি মেটা শিশু সুরক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব সংক্রান্ত দুটি আলাদা মামলায় হেরে যাওয়ার পর এসব আইনি তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে।
সান্তা ফে’র এক মামলায় জুরিরা বলেছেন, মেটা নিজেদের বিভিন্ন অ্যাপে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে।
এর ঠিক পরের দিনই লস অ্যাঞ্জেলেসের জুরিরা রায় দিয়েছেন, মেটা ও ইউটিউব তাদের প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন ফিচার এমনভাবে তৈরি করেছে, যা এক বাদীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে।
‘লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স’-এর ‘ডিজিটাল ফিউচারস ফর চিলড্রেন সেন্টার’-এর পরিচালক ও সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন বলেছেন, এসব ঘটনা ভবিষ্যতে ‘আরও অনেক নতুন আইন তৈরির পথ খুলে দেবে’।
তবে লিভিংস্টোন বলছেন, টিনএজারদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ আসলে তাড়াহুড়ো করে নেওয়া এক দায়সারা সমাধান। কারণ, বিভিন্ন সরকার বছরের পর বছর ধরে এসব প্রযুক্তি জায়ান্টদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
“আমার ধারণা, নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি দেওয়া আসলে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়ার মতোই। যেহেতু আমরা কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না ফলে আমরা কেবল শিশুদেরই আটকে দিচ্ছি।”
তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এরইমধ্যে অনেক আইন রয়েছে। তবে সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না।
লিভিংস্টোন প্রশ্ন করেন, “সরকারগুলো আসলে কবে নাগাদ এসব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করবে, জরিমানার পরিমাণ বাড়াবে বা নিয়ম না মানলে প্রয়োজনে বিভিন্ন কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করবে?”
বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি খাত দীর্ঘ সময় ধরে জবাবদিহিতা ও অন্যান্য শিল্পখাতের মতো কঠোর নিয়মকানুন এড়িয়ে চলেছে।
লিভিংস্টোন বলেছেন, “সরকারগুলোর উচিত বিদ্যমান আইন কার্যকর করা ও বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিকে এমন কিছু হস্তক্ষেপের মুখোমুখি করা, যা তাদের বর্তমানের অনেক বিতর্কিত চর্চাকে নিষিদ্ধ করবে।”
তিনি যুক্তরাজ্যের ‘অনলাইন সেইফটি অ্যাক্ট’-এর কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এ আইনে ‘সেইফটি বাই ডিজাইন’ বা নকশাতেই নিরাপত্তার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যার মানে, স্ন্যাপচ্যাটের ‘কুইক অ্যাড’-এর মতো বিভিন্ন ফিচার যেগুলো টিনএজারদের অপরিচিত কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে উৎসাহিত করে সেগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানিগুলো যদি তাদের বিভিন্ন ফিচার ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ কি না তা বাজারে ছাড়ার আগেই যথাযথভাবে পরীক্ষা করত তবে আজ ঢালাও নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রশ্নই উঠত না বলেও মনে করছেন লিভিংস্টোন।

“এমন অনেক ক্ষেত্র আছে, যেখানে বাজার ব্যবস্থা বেশ কার্যকর। কারণ, সেখানে পণ্য বাজারে ছাড়ার আগে মানদণ্ড অনুসারে পরীক্ষার প্রয়োজন। আমরা যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রেও এমনটি করতাম তবে আজ আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে থাকতাম এবং শিশুদের কোনো কিছু থেকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আমাদের কথা বলতে হত না।”
বস্টনভিত্তিক অলাভজনক কোম্পানি ‘ফেয়ারপ্লে ফর কিডস’-এর নির্বাহী পরিচালক জশ গোলিন বলেছেন, তিনি পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ‘ঢালাও নিষেধাজ্ঞার বদলে নকশাতেই প্রাইভেসি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের মতো আইন’ দেখতে চান।
যার মধ্যে রয়েছে ‘চিলড্রেন অ্যান্ড টিন অনলাইন প্রাইভেসি প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ পাস করা, যাতে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন দেখানো বন্ধ হয়। এতে করে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানিগুলোর জন্য শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানানো বা তাদের আসক্ত করার আর্থিক সুযোগ কমে আসবে’।
গোলিন বলেছেন, সেনেটে প্রস্তাবিত ‘কিডস অনলাইন সেইফটি অ্যাক্ট’ পাস করাও জরুরি। আইনটি নিশ্চিত করবে, যেসব ফিচারের কারণে শিশুরা আসক্ত বা ক্ষতির শিকার হচ্ছে এর জন্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মই দায়ী থাকবে।
২০২৪ সালে সেনেটে বিলটি পাস হওয়ার পরও মেটা লবিয়িংয়ের মাধ্যমে আইনটিকে থামিয়ে দিতে পেরেছে। তবে গোলিনের ধারণা, তারা যদি এভাবে আইন বাধাগ্রস্ত করা চালিয়ে যায় তবে ‘নিষেধাজ্ঞার পক্ষেই জনমত ও চাপ আরও বাড়বে। কারণ আসক্তিকর ও অনিরাপদ কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়’।
নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে ‘অলস’ ও ‘অন্যায্য’
লিভিংস্টোন বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ঢালাও নিষেধাজ্ঞা কেবল সেই প্রজন্মের তরুণদেরই শাস্তি দেয়, যারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনলাইন মাধ্যমের ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা বিভিন্ন সরকারের জন্য ‘অলস’ সমাধান ও তরুণদের জন্য ‘অন্যায্য’ পরিণতি।
“গত ১৫ বছর ধরে আমরা আমাদের সন্তানদের বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে দেইনি। গেল ১৫ বছর ধরে আমরা তাদের আড্ডা দেওয়ার জায়গা যেমন, পার্ক বা ক্লাবগুলোতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছি।
“ফলে এখন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মানে, শিশুদের বলা যে, ‘আমরা নিয়মকানুন ঠিকঠাক কার্যকর করতে পারছি না। আমরা দ্রুত আইন উন্নত করতে পারছি না। তোমাদের জন্য আমরা বিকল্প কিছু তৈরিও করিনি। তবে, তাতে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা তোমাদের মা-বাবাদের মনে এমন ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছি যে, তারা অসহায় বোধ করছেন। আর এখন আমরা তোমাদের সেসব সেবা থেকেই সরিয়ে দিচ্ছি যেখানে তোমরা কিছুটা সামাজিকতা আর বিনোদনের আশা করতে’।”
এদিকে, ‘অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট’-এর সহযোগী অধ্যাপক ও সিনিয়র পলিসি ফেলো ড. ভিক্টোরিয়া ন্যাশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর এ নিষেধাজ্ঞাকে ‘চরম’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, এর ফলে তরুণরা এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে যেসব সুবিধা পেতে পারত, সেগুলো থেকেও বঞ্চিত হয়।
ড. ন্যাশ বলেছেন, “আমরা জানি শিশু ও তরুণরা অনলাইন এবং বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমেই খবর পায়। ফলে নিষেধাজ্ঞা দিলে সে পথ বন্ধ হয়ে যাবে। বিষয়টি কোনোভাবেই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে না, বরং এর থেকে প্রমাণ মেলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত, যাতে তারা তাদের ক্ষতিকর ফিচারগুলো কমিয়ে আনে।”
এমন নিষেধাজ্ঞা তরুণ ও শিশুদের ইন্টারনেটের এমন সব অনিয়ন্ত্রিত জায়গায় ঠেলে দিতে পারে, যেখানে নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই।
ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সময় অনেক টিনএজারই তা মানেনি। বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশটির নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ এড়াতে অবস্থান লুকিয়ে রাখার প্রযুক্তি বা ভিপিএন ডাউনলোডের পরিমাণ নিষেধাজ্ঞার আগেই বেড়ে গিয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিবেদন অনুসারে, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ‘লেমনএইট’, ‘ইয়োপ’ ও ‘ডিসকর্ড’-এর মতো যেসব অ্যাপের ওপর তখনও নিষেধাজ্ঞা আসেনি সেগুলোর ডাউনলোডের সংখ্যাও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
ন্যাশ বলেছেন, “আমার মনে হয় নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই ক্ষতিকর দিকগুলো দূর করে। তবে তা ভালো দিকগুলোকেও কেড়ে নেয়। আমি এখনও নিশ্চিত নই, নিষেধাজ্ঞা (ক্ষতির তুলনায়) কতটা যুক্তিযুক্ত।”