Published : 08 Mar 2026, 04:05 PM
কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা নয়, এবার বাস্তবেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় ইতিহাস গড়ল চীনা রোবট। মাইনাস ৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কদম হেঁটে এই হিউম্যানয়েড রোবটটি প্রমাণ করল, ভবিষ্যতে দুর্গম ও বিপজ্জনক পরিবেশে মানুষের জায়গা নিতে প্রস্তুত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি।
প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘লস্ট ইন স্পেস’, ‘ডক্টর হু’, ‘স্টার ট্রেক’ ও ‘জেটসন্স’-এর মতোবিংশ শতাব্দী ও তার পরবর্তী সময়ের সিনেমা ও টিভি সিরিয়ালগুলোতে রোবটের বিষয়টি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। এসব রোবট কখনও ছিল ‘ডক্টর হু’-এর ‘ডালেক’-এর মতো ভয়ঙ্কর শত্রু, আবার কখনও ‘জেটসন্স’-এর ‘রোজি’র মতো বিশ্বস্ত সঙ্গী।
তবে বাস্তব জীবনের রোবট নিয়ে মানুষের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ‘ইউনাইটেড রোবটিক্স’-এর জরিপ অনুসারে, অধিকাংশ মানুষ এমন রোবট পছন্দ করে না, বিশেষ করে সেটি যদি দেখতে হুবহু মানুষের মতো হয়। এর চেয়ে বরং ‘আর২-ডি২’-এর মতো যান্ত্রিক চেহারার রোবটই বেশি গ্রহণযোগ্য।
এরপরও বর্তমানে বেশ কিছু হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির কাজ চলছে, যার পেছনে রয়েছে মার্কিন বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি টেসলা ও বস্টন ডায়নামিক্স-এর মতো আলোচিত সব কোম্পানি।
চীনা কোম্পানি ‘ইউনিট্রি রোবটিক্স’-এর তৈরি নতুন এক রোবট হয়ত মানুষের কাছে খুব একটা ভয়ের হবে না। কারণ, রোবটটি উচ্চতায় কেবল চার ফুটের কিছু বেশি, সাধারণ আট বছর বয়সী শিশুর সমান।
চীনা কোম্পানির ‘জি১’ নামের রোবটটি সম্প্রতি তার উচ্চতার জন্য নয়, বরং হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দীর্ঘক্ষণ হাঁটার মাধ্যমে ইতিহাস গড়েছে। রোবটটি চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের বরফে ঢাকা আলতাই অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কদম হেঁটেছে। তীব্র ঠান্ডার মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ চলার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম কোনো হিউম্যানয়েড রোবটের রেকর্ড।
সেখানকার তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৭.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ফোন বা ট্যাবলেটকে নিমিষেই অচল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
রোবটের এ পদযাত্রাটি কেবল প্রচারের জন্য কোনো সাশ্রয়ী কৌশল ছিল না, বরং তা প্রমাণ করেছে, ঠান্ডা জলবায়ুতেও রোবট ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে বিপজ্জনক ও চরম প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের কাজের প্রয়োজনীয়তা কমে আসতে পারে।
নিজের চাকরি কোনো রোবট দখল করে নিচ্ছে– এমন ধারণা কারোই পছন্দ নয়, তবে হাড়কাঁপানো প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে কাজ করতে কারোরই ভালো লাগার কথা নয়।
অত্যধিক নিম্ন তাপমাত্রায় বেঁচে থাকার জন্য মানুষের যেমন বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়, রোবটদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা কিছু নয়।
বরফের ওপর দীর্ঘ এই হাঁটার প্রস্তুতির জন্য রোবটটিকে কমলা রঙের ইনসুলেটেড বা তাপরোধী উইন্টার কোট পরিয়েছিল ইউনিট্রি রোবটিক্স। এর মোটর, জয়েন্ট ও ব্যাটারি প্যাকগুলো সুরক্ষিত রাখতে রোবটের পায়ে প্লাস্টিকের হাতা বা কভার ব্যবহৃত হয়েছে।
এর পুরো যাত্রাটি ছিল আগে থেকে পরিকল্পিত ও সময়োপযোগী, যেখানে অসমতল ভূখণ্ডে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে রোবটটি বরফের ওপর প্রায় ৬১০ ফুট দীর্ঘ ও ৩২৮ ফুট চওড়া বড় এক অলিম্পিক প্রতীক এঁকেছে।
এর কনফিগারেশন বা গঠনের ওপর ভিত্তি করে রোবটটিতে ২৩ থেকে ৪৩টি জয়েন্ট মোটর রয়েছে। এটি ‘কুইক রিলিজ’ ব্যাটারির সাহায্যে চলে, যা প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত চার্জ ধরে রাখতে পারে।
পুরো পথটি পাড়ি দেওয়ার জন্য কিছু উন্নত সেন্সরের ওপর নির্ভর করেছে রোবটটি, যার মধ্যে রয়েছে ‘থ্রিডি লাইডার’ ও ডেপথ ক্যামেরা। ভয়েস কন্ট্রোল বা কথা দিয়ে নিয়ন্ত্রণের জন্য এতে ‘নয়েজ ক্যানসেলিং’ মাইক্রোফোন ও ন্যাভিগেশনের জন্য চীনের ‘বেইডৌও’ স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহৃত হয়েছে।
রোবটের বিশেষ সফটওয়্যার ভারসাম্য বজায় রেখে লক্ষ্য পূরণের জন্য সেরা পথটি বেছে নিতে সাহায্য করেছে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রায় সোয়া সাত কিলোমিটার বেগে হাঁটতে পারে এটি।
রোবটটির সক্ষমতা নিয়ে ইউনিট্রি রোবটিক্সের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভবত শেষ হয়নি। তবে এরইমধ্যে নিজেদের অন্যান্য চার পাওয়ালা বিভিন্ন রোবটের সঙ্গে ‘জি১’ বিক্রির জন্য বাজারে ছাড়া হয়েছে। এর দাম শুরু হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ২৪০ ডলার থেকে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি প্রায় ৪ হাজার ২০০টি রোবট বিক্রি করেছে।
রোবটটি আপাতত বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রজেক্টে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোনো কারখানা বা কর্মস্থলে নয়। ঠিক এ কারণেই ইউনিট্রি রোবটিক্স এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় হাঁটার মতো বিভিন্ন পরীক্ষা চালাচ্ছে।
এমন ভবিষ্যত খুব বেশি দূরে নয়, যেখানে বিভিন্ন রোবট হয়ত ‘জেটসন্স’-এর ‘রোজি’র মতো মানুষের জুতা এগিয়ে দেবে না, বরং এরা হিমাগারগুলোতে ও বরফ পড়ার পর পার্কিং লট বা রাস্তা পরিষ্কার করবে বা মেরু অঞ্চলের কঠিন আবহাওয়ায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজও করবে।