Published : 06 Jul 2026, 03:23 PM
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বাজার ধরতে এখন মরিয়া ভারত ও ফ্রান্স। এ দৌড়ে নিজেদের দেশকে এগিয়ে রাখতে কূটনীতির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি মাঠে নেমেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের শীর্ষ টেক জায়ান্টদের মন জয় করা এবং নিজ দেশে হাজার কোটি ডলারের বড় এআই প্রজেক্ট ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই এখন এই দুই নেতার মূল লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
এ বছর বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদারের পদক্ষেপ বাড়িয়েছেন মাক্রোঁ ও মোদী সরকার।
এআই প্রযুক্তি সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় থাকা অন্যান্য দেশের মধ্যে এ দুজন বিশেষভাবে আলাদা হয়ে উঠেছেন, কারণ তারা বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছেন।
যেমন, গেল জুনে অনুষ্ঠিত ‘জি-৭’ সম্মেলনে এআই খাতের শীর্ষ কর্তাদের আমন্ত্রণ এবং সেখানে জাপানি বহুজাতিক কোম্পানি সফটব্যাংকের প্রধান মাসায়োশি সনকে রাজি করিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, যেন সন ফ্রান্সে এআই ডেটা সেন্টার তৈরিতে ‘হাজার কোটি ডলারের’ বড় বিনিয়োগ করেন।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার অ্যামাজনের সিইও অ্যান্ডি জ্যাসির সঙ্গে দেখা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং দেশটিতে এ মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টের ‘রেকর্ড ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগকে’ সাদরে স্বাগত জানান তিনি, যার মধ্যে ‘২ হাজার ১০০ কোটি ডলারই’ খরচ হবে এআই ও ক্লাউড অবকাঠামো তৈরির পেছনে।
এ ছাড়া গেল বছর মাইক্রোসফটের সিইও সাত্যিয়া নাদেলা, গুগলের সিইও সুন্দার পিচাই ও ইনটেলের সিইও লিপ-বু তান-এর সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন মোদী, যার ফলে তারা সবাই ভারতের এআই পরিবেশ উন্নয়নে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন।
এআই প্রধানদের জন্য মাক্রোঁর আতিথেয়তা
এআই খাতের শীর্ষ নেতাদের বিশেষ এক বৈঠকের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। এর আগে, মে মাসে সফটব্যাংক ২০৩১ সালের মধ্যে ফ্রান্সে ৩.১ গিগাওয়াট সক্ষমতার এআই ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, যা ছিল তাদের ৫ গিগাওয়াট সক্ষমতার এআই ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণে ‘৭ হাজার ৫০০ কোটি ইউরোর’ মেগা প্রজেক্টের অংশ।
এ ঘোষণার ঠিক দুই মাস আগে, মাক্রোঁ সফটব্যাংকের প্রধান মাসায়োশি সনকে এ প্রজেক্টের ব্যাপারে রাজি করাতে একটি বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছিলেন এবং বিস্তারিত খুঁটিনাটি চূড়ান্তের সময় তারা দুজনে পরস্পরের সঙ্গে টেক্সট মেসেজও আদান-প্রদান করেন বলে জানিয়েছেন সন।
তিনি বলেছেন, মাক্রোঁ ফ্রান্সের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। দেশটি বিদ্যুতের বড় অংশ পারমাণবিক শক্তি থেকে পায় এবং ফরাসি প্রধানমন্ত্রী প্রথমে যে ২ গিগাওয়াটের প্রস্তাব করেছিলেন তার পরিবর্তে সফটব্যাংকের প্রজেক্টের জন্য ৩ গিগাওয়াট বিদ্যুতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এ আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে সন বলেছেন, “তার দল অনেক সহযোগিতাপূর্ণ’ এবং ‘তার ও আমাদের দল একে অপরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে’।
প্রায় একই সময়ে, ফ্রান্সের আতিথেয়তায় জুনে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের এক বিশেষ ওয়ার্কিং লাঞ্চে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য মাক্রোঁ প্রযুক্তি জগতের বড় কর্তাদের আমন্ত্রণ জানান, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও উপস্থিত ছিলেন।
এ মধ্যাহ্নভোজে ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, অ্যানথ্রপিকের দারিও আমোদেই ও গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিসের মতো শীর্ষ নির্বাহীরা অংশ নিয়েছেন।
প্রযুক্তি প্রধানদের মধ্যে সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্সের নিজস্ব ‘মিস্ট্রাল’-এর সিইও আর্থার মেনশ, কানাডার ‘কোহিয়ার’-এর সিইও এইডান গোমেজ, ইতালীয় কোম্পানি ‘ডমিন্স’-এর উলজান শার্কা, যুক্তরাজ্যের এআই স্কেলআপ ‘সিন্থেসিয়া’র ভিক্টর রিপারবেলি ও জার্মানিভিত্তিক ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট ল্যাবস’-এর রবিন রোমবাখ।
ভারত
বছরের শুরুতে ভারতে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল এআই সামিটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও আমেরিকার শীর্ষ প্রযুক্তি নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যার ফলে ভারতের এআই খাতের উন্নয়নে শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে।
গেল ফেব্রুয়ারিতে সেই সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে মোদী বিশ্ব প্রযুক্তি নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “ভারত এআইয়ের মধ্যে কোনো ভয় দেখে না। ভারত এআইয়ের মধ্যে ভাগ্য দেখে। ভারত এআইয়ের মধ্যেই ভবিষ্যৎ দেখে।”
একইসঙ্গে তিনি বিশ্ব দরবারে সেবা পৌঁছে দিতে প্রযুক্তি প্রধানদের ‘ভারতে ডিজাইন ও ডেভেলপের’ আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতের জন্য এআই খাতের উন্নয়ন, বিনিয়োগ নিশ্চিত ও অংশীদারিত্ব তৈরি করা মোদীর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
ভারত এখনও অভ্যন্তরীণভাবে আধুনিক চিপ তৈরি করতে পারেনি এবং আমেরিকার বা চীনের শীর্ষ মডেলগুলোর সমকক্ষ কোনো সামনের সারির এআই মডেলও তাদের নেই। ফলে এআই দৌড়ে ভারতকে অনেকেই বেশ পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবেই দেখে।
আর মোদী এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে চান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিকে দেশের মাটিতে এআই অবকাঠামো ও চিপ তৈরিতে বিনিয়োগের জন্য প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করে যাচ্ছেন।
এ সম্মেলনের কয়েক মাস আগেই, ভারতের এআইভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে এশিয়ায় মাইক্রোসফটের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে ভারত।
পাশাপাশি, আমেরিকার বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এআই কেন্দ্র গড়ে তুলতে গুগল ভারতে ‘দেড় হাজার কোটি ডলার’ বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনে বিভিন্ন কোম্পানিকে উৎসাহিত করতে মোদী সরকার তাদের দীর্ঘমেয়াদী কর ছাড়ের সুবিধাও দিয়েছে। দেশটির স্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানি যাতে ভারতেই সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করতে পারে সেটিকেও উৎসাহ দিচ্ছে ভারত।
মে মাসে মোদীর নেদারল্যান্ডস সফরের সময় ডাচ কোম্পানি ‘এএসএমএল’ বলেছে, তারা ভারতীয় কোম্পানি টাটা ইলেকট্রনিক্সের বসানো ৩০০ মিলিমিটার সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব বা কারখানার জন্য উন্নত লিথোগ্রাফি সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ করবে।
গেল বছরের ডিসেম্বরে মোদীর সঙ্গে দেখা করে ইনটেলের লিপ-বু তান’ও টাটা ইলেকট্রনিক্সের তৈরি চিপের একজন সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে চুক্তি করেছেন। ভারত এখনও বিদেশি এআই মডেল ও কম্পিউটিং হার্ডওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশটির এআই স্বপ্নকে অন্য দেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির সামনে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বড় ধরনের কোনো দেশীয় এআই উদ্যোগ না থাকায় সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে এআই শেয়ার বাজারের যে বিপুল উত্থান হয়েছে তা থেকে ভারত পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে। এ বিষয়টিই মূলধন ও প্রযুক্তি আকর্ষণে মোদীর এই মরিয়া চেষ্টা এবং তাগিদকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে।