Published : 07 May 2026, 02:58 PM
শৈশবে দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় প্রজনন সক্ষমতা হারানো পুরুষদের জন্য আশার আলো নিয়ে এল আধুনিক বিজ্ঞান।
এক যুগান্তকারী গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৬ বছর আগে হিমায়িত করে রাখা টিস্যু পুনরায় দেহে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি শুক্রাণু উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন।
চিকিৎসা ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে বয়ঃসন্ধির আগে সংরক্ষণ করা টিস্যু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রজনন ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
বর্তমানে ২৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি যখন ১০ বছরের শিশু ছিলেন তখন ‘সিকেল সেল’ রোগের চিকিৎসায় তাকে কেমোথেরাপি নিতে হয়েছিল। চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় প্রজনন সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি থাকায় তখন তার টিস্যুর নমুনা হিমায়িত করে রাখা হয়।
এ ঘটনাকে ‘বড় প্রাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এ গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ‘ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস’ এর অধ্যাপক এলেন গুসেনস।
তিনি বলেছেন, “এ সাফল্যের ফলে আরও অনেক মানুষ এখন নিজেদের সন্তান লাভের স্বপ্ন দেখতে পারবেন, বিশেষ করে যেসব রোগীদের টিস্যু আগে থেকেই আমরা প্রজনন ব্যাংকে জমা রেখেছি তাদের জন্য এ তথ্য নতুন আশার আলো হতে পারে।”
কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির মতো চিকিৎসা ক্যান্সার বা সিকেল সেল আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচাতে অপরিহার্য হলেও এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তারা চিরতরে প্রজনন সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন।
সাধারণত বয়ঃসন্ধির পর পুরুষ রোগীদের শুক্রাণু সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে আইভিএফ পদ্ধতিতে ব্যবহারের সুযোগ থাকে। তবে বয়ঃসন্ধির আগের শিশুদের ক্ষেত্রে এ সুযোগ নেই।
এ সংকট নিরসনে ২০০২ সালে বেলজিয়ামের এক ক্লিনিক প্রথমবারের মতো বয়ঃসন্ধির আগে শিশুদের অণ্ডকোষের টিস্যু ব্যাংকিং বা সংরক্ষণ শুরু করে। এ অপরিণত টিস্যুর মধ্যে থাকে বিশেষ কিছু স্টেম সেল, যা ভবিষ্যতে শুক্রাণু তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
এ ছাড়া এতে থাকে ‘সারটোলি কোষ’, যা শুক্রাণুর বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যাপক গুসেনস ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, “তখন এ গবেষণার ক্ষেত্রটি ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। এসব পদ্ধতি কেবল প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা করা হচ্ছিল।
“আমরা তখন রোগীদের পরিবারকে বলেছিলাম, ভবিষ্যতে এ টিস্যু দিয়ে প্রজনন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না তার কোনো গ্যারান্টি আমরা দিতে পারছি না।”
ক্লিনিকটিতে যারা শুরুতে চিকিৎসা নিয়েছিলেন তাদের অনেকেই এখন বিশের কোঠায় এবং তাদের কেউ কেউ এখন নিজের পরিবার তৈরির কথা ভাবছেন। তাদের মধ্যেই একজন হচ্ছেন সেই প্রথম রোগী, যার দেহে সংরক্ষিত টিস্যু পুনরায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
২০০৮ সালে ওই রোগীর ‘সিকেল সেল’ রোগের চিকিৎসার জন্য বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের আগে উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল, যাতে তার দেহের পুরানো বিভিন্ন রক্তকণিকা ধ্বংস করা যায়।
সেই চিকিৎসার ঠিক আগেই চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি অণ্ডকোষ সরিয়ে সেটিকে ছোট ছোট টুকরা করে হিমায়িত করে রাখেন।
গত বছর সেই সংরক্ষিত টিস্যুর চারটি অংশ তার অবশিষ্ট অণ্ডকোষে এবং বাকি চারটি অণ্ডকোষের চামড়ার নিচে প্রতিস্থাপন করেন চিকিৎসকরা। এক বছর দেহের ভেতর থাকার পর সেসব টিস্যু পুনরায় বের করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা হয়।
এ গবেষণার ফলাফল প্রি-প্রিন্ট পেপারে প্রকাশিত হয়েছে, যা এখনও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পর্যালোচিত হয়নি।
গবেষণায় দেখা গেছে, অণ্ডকোষের ভেতরে স্থাপন করা টিস্যুগুলোর দুটি অংশ থেকে পরিপক্ক শুক্রাণু তৈরি হয়েছে, যা সংগ্রহ করে বর্তমানে হিমায়িত আছে। এসব টিস্যু সরাসরি শুক্রাণু নালীর সঙ্গে যোগ নয় ফলে গবেষকরা বলছেন, এসব শুক্রাণু প্রাকৃতিকভাবে বীর্যের সঙ্গে মিশতে পারবে না।
এক্ষেত্রে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতিই হবে সন্তান লাভের মূল উপায়।
অধ্যাপক গুসেনস বলেছেন, “আলাদা করা শুক্রাণুগুলো দেখতে স্বাভাবিক ছিল। তবে এগুলো ডিম্বাণু নিষিক্ত করতে পারে কি না তা আমাদের এখনও দেখতে হবে।”
‘ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা’র ‘রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ সেন্টার’ এর শিশু এন্ডোক্রিনোলজিস্ট অধ্যাপক রড মিচেলও একই ধরনের পরীক্ষা চালাচ্ছেন।
২০১৪ সাল থেকে সেখানে অণ্ডকোষের টিস্যু সংরক্ষণ শুরু হয় এবং অক্সফোর্ড ও লন্ডনের সহকর্মীদের সহায়তায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের এক হাজারেও বেশি রোগীর নমুনা হিমায়িত রাখা হয়েছে।
এ সাফল্য সম্পর্কে মিচেল বলেছেন, “মানুষের ওপর এ পদ্ধতিটি যে কাজ করবে, তার এক নীতিগত প্রমাণ এখন পাওয়া গেছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর।”
খুব শিগগিরই তার ক্লিনিকেও প্রথম প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু হবে।
“আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম, এটি সম্ভব। আপনি যদি টিস্যু হিমায়িত করে বিভিন্ন কোষকে জীবিত রাখতে পারেন তবে সেগুলোর সম্ভাবনা থাকা উচিত। আপনি টিস্যুটিকে পুনরায় দেহের এমন এক নিখুঁত পরিবেশে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, যা একে উদ্দীপিত করবে। বৈজ্ঞানিক ও জৈবিকভাবে বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত হলেও বাস্তবে তা ঘটতে দেখাটা এখনও এক অভাবনীয় ব্যাপার।”
গোটা বিশ্বে বর্তমানে তিন হাজারেও বেশি রোগীর অণ্ডকোষের টিস্যু ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে। যুক্তরাজ্যে ধারণা করা হয়, প্রতি বছর প্রায় ২০০ জন রোগী এ পদ্ধতি থেকে উপকৃত হতে পারেন।
এদিকে, এখন ২৭ বছর বয়সী ওই তরুণ বিবেচনা করছেন তিনি কি আরও শুক্রাণু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় দফায় টিস্যু প্রতিস্থাপন করবেন, না কি খুব শিগগিরই আইভিএফ পদ্ধতির মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপে এগিয়ে যাবেন।