Published : 23 Jul 2026, 04:09 PM
উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটক বা সনেটের পাতা ওল্টালেই ভেসে ওঠে হরেক পদের গাছপালা ও ফুলের নাম। কালজয়ী এ ইংরেজ সাহিত্যিকের রচনায় প্রকৃতির প্রতি যে অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে, তাকে সম্মান জানাতে বিশ্বজুড়ে জন্ম নিয়েছে ‘শেক্সপিয়ার গার্ডেন’ বা শেক্সপিয়ার উদ্যান।
লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, জোহানেসবার্গ কিংবা নিউ জিল্যান্ডের দুনেদিন- বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের বোটানিক্যাল গার্ডেন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় হঠাৎ দেখা মিলতে পারে এই বিশেষ উদ্যানের। শেক্সপিয়ার গার্ডেন কী? এটি এমন এক বিশেষায়িত উদ্যান, যেখানে কেবল শেক্সপিয়ারের বিভিন্ন নাটক ও সনেটে উল্লিখিত ফুল, ফল, ভেষজ ও অন্যান্য গাছপালা রোপণ করা হয়।
এগুলো মূলত এলিজাবেথীয় যুগের (১৫৫৮-১৬০৩) জনপ্রিয় ‘কটেজ-স্টাইল’ বাগানগুলোর অনুকরণে তৈরি। ছোট ছোট ঘন ফুলের বেড, জ্যামিতিক নকশার পথ এবং চারপাশের হেজ বা ঝোপঝাড় দিয়ে সাজানো এসব বাগানে শোভা পায় বিভিন্ন নাটকের বিখ্যাত উক্তি খোদাই করা ফলক।
যেমন, রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকের সেই অমর লাইন: “কী যায় আসে নামে? গোলাপকে অন্য যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তা সমান সুবাস ছড়াবে।” কিংবা অ্যা মিডসামার নাইট’স ড্রিম-এর: “আমি এমন এক তীর জানি যেখানে বুনো থাইম বাতাসে দোলে, যেখানে ফুটে থাকে অক্সলিপ আর হেলানো ভায়োলেট।” অথবা হ্যামলেট-এর সেই চিরচেনা স্মৃতি ও ভাবনার কথা: “সেখানে আছে রোসমেরি, যা স্মৃতির প্রতীক; ভালোবাসা, তুমি মনে রেখো। আর আছে প্যানসি, যা ভাবনার স্মারক।”
পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টড বরলিকের মতে, শেক্সপিয়ার তার সাহিত্যকর্মে প্রায় ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ফুলের উল্লেখ করেছেন। এটি প্রকৃতি সম্পর্কে তার জানাশোনা ও পর্যবেক্ষণের প্রমাণ। গবেষক বরলিক মনে করেন, মানুষ চিরকালই প্রকৃতির মাঝে এক স্বর্গীয় মরূদ্যান খোঁজার চেষ্টা করে এসেছে, যা অ্যাডাম ও ইভের ‘গার্ডেন অব ইডেন’-এর মতো প্রাচীন ধারণার সঙ্গে যুক্ত। ‘শেক্সপিয়ার গার্ডেন’ মানুষের সেই প্রাক-প্রাকৃতিক আকাঙ্ক্ষারই একটি ধর্মনিরপেক্ষ রূপ।
বিশ্বজুড়ে অনন্য কিছু ‘শেক্সপিয়ার গার্ডেন’ রয়েছে। যেমন নিউ ইয়র্কে ‘ব্রুকলিন বোটানিক গার্ডেন’। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং পরবর্তীকালে ১৯৭৯ সালে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নতুন স্থানে স্থানান্তরিত এই বাগানে শেক্সপিয়ারের রচনায় উল্লিখিত ৮০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এতে টিউলিপ, লেটুস, বিভিন্ন ধরনের বেরি এবং অ্যাস্টার ফুলগাছের পাশাপাশি চমৎকার উদ্যানশিল্পের পরিচয় মেলে।
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে রয়েছে ‘প্ল্যাট ফিল্ডস পার্ক’। ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বাগানটি মাঝে কিছুকাল জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। পাঁচ বছর আগে ক্যাটি কিনকাইডের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবীরা এটি পুনরুদ্ধার করেন। এখানে গ্রীষ্মে গোলাপ, হানিসাকল, ডেইজি, ল্যাভেন্ডার, গাঁদা ও পোপি ফোটানো হয়, আর শরতে ফোটে প্যানসি ও কলম্বাইন। এতে দর্শনার্থীদের ছায়ানির্ভর সময় মাপার একটি ‘হিউম্যান সান ক্লক’ বা রোদঘড়ি এবং নিয়মিত সাহিত্য পাঠের আয়োজন রয়েছে।
যুক্তরাজ্যেই আরেকটি ‘শেক্সপিয়ার গার্ডেন’ হলো ‘স্ট্রেফোর্ড-আপন-অ্যাভন’। শেক্সপিয়ারের জন্মস্থানে ‘শেক্সপিয়ার বার্থপ্লেস ট্রাস্ট’-এর অধীনে পাঁচটি মিউজিয়াম ও বাগান রয়েছে এতে। এর মধ্যে শেক্সপিয়ারের শেষ জীবনের বাড়ি ‘নিউ প্লেস’-এর ‘দ্য গ্রেট গার্ডেন’ অন্যতম, যা আধুনিক ডিজাইন ও ভাস্কর্যে সজ্জিত। আরেকটি হলো নিউ জিল্যান্ডের ‘দুনেনিক বোটানিক গার্ডেন’। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ উদ্যানটি শেক্সপিয়ারের মৃত্যুর স্মৃতিতে তৈরি করা হয়েছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে নিউ জিল্যান্ড ইউরোপীয় অভিবাসীদের আকৃষ্ট করতে পরিপক্ক শহরের প্রতীক হিসেবে এটি গড়ে তোলে।
তবে বিশ্বের প্রথম ‘শেক্সপিয়ার গার্ডেন’ সাজানো হয় ১৮৯২ সালে লন্ডনে। এটি তৈরি করেন লন্ডন কাউন্টি কাউন্সিল পার্কস ডিপার্টমেন্টের প্রথম প্রধান কর্মকর্তা জে.জে. সেক্সবি। সেসময় দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ভিনদেশি গাছ এনে বাগান সাজানোর ‘বেডিং আউট’ ট্রেন্ড চালু হয়েছিল। সেক্সবি এর বিপরীতে ব্রিটিশ লোকজ ও দেশীয় গাছপালা দিয়ে ট্র্যাডিশনাল কটেজ বাগান ফিরিয়ে আনতে এ উদ্যোগ নেন। তাছাড়া নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ভিড়ে মানুষ প্রাচীন, হাতে-কলমে করার মতো উদ্যানচর্চায় ফিরতে চেয়েছিল।
১৯১৬ সালে শেক্সপিয়ারের মৃত্যুর ৩০০তম বার্ষিকী (টেরসেন্টেনারি) উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে অনেক বাগানের পরিকল্পনা করা হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাজ্যের অনেক পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়, তবে ম্যানচেস্টারে শেক্সপিয়ার সংগ্রাহক রোজা গ্রিনডন একটি বাগান তৈরি করতে পেরেছিলেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে দেরিতে যোগ দেওয়ায় তারা এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে থাকে। নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ৪ একরের শেক্সপিয়ার গার্ডেনটি ১৯১৬ সালের ২৩ এপ্রিল খুলে দেওয়া হয়। ডেনভার, ইলিনয় থেকে শুরু করে নর্থওয়েস্টার্ন ও ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসের মতো ডজনখানেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এগুলো গড়ে ওঠে। আমেরিকানরা এগুলোকে যুক্তরাজ্যের ‘ভিক্টরি গার্ডেন’-এর সমতুল্য মনে করে মিত্রদের সমর্থনার্থে গড়ে তুলেছিল। বর্তমানে উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৯টি নিবন্ধিত ‘শেক্সপিয়ার গার্ডেন’ রয়েছে।
পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বরলিকের মতে, অনেক শিক্ষার্থী প্রকৃতি সম্পর্কে একপ্রকার ‘পরিবেশগত নিরক্ষরতায়’ ভোগে। কিন্তু সাহিত্যের বই পড়া শিক্ষার্থীরা যখন সরাসরি শেক্সপিয়ার গার্ডেনে গিয়ে গোলাপ, প্রাইমরোজ বা কলম্বাইনের ঘ্রাণ নেয়, তখন বইয়ের রূপকগুলো তাদের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে। শেক্সপিয়ারের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি নথি পাওয়া না গেলেও তার সম্পত্তির হিসাব পাওয়া যায়। সেন্ট্রাল পার্ক বা স্ট্রেফোর্ড-আপন-অ্যাভনের বাগানগুলো দেখলে বোঝা যায় ঠিক কী ধরনের গ্রাম্য আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দৃশ্য নাট্যকারকে বিশ্বজয়ী গল্প রচনায় অনুপ্রাণিত করেছিল।
বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী ফুলগাছ বুনো পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক উদ্যানবিদ ও কিউরেটররা শেক্সপিয়ারের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি বাগানগুলোতে জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। ‘শেক্সপিয়ার গার্ডেন’ কেবল ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো বাগান নয়; এটি সাহিত্য, ইতিহাস ও প্রকৃতির এক বিরল ত্রিবেণী সংগম, যা চার শতক পরও মানুষকে প্রকৃতির কাছে টেনে আনছে।
সূত্র: বিবিসি, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, দ্য প্যারিস রিভিউ।