Published : 24 Apr 2026, 10:07 AM
মহাকাশ গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার পর এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বাজারেও আধিপত্য গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স।
ইতিহাসের বৃহত্তম আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসার লক্ষ্য নিয়ে কোম্পানিটি বলেছে, তাদের ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি হবে বিভিন্ন বড় কোম্পানির জন্য তৈরি বিশেষায়িত এআই প্রযুক্তি।
২৫ বছর ধরে মহাকাশযাত্রাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া ও মহাকাশ গবেষণাকে একটি লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করেছেন মাস্ক। এবার স্পেসএক্স তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে এআইকে বেছে নিয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও কার্যকরী।
রয়টার্স লিখেছে, বিভিন্ন বড় কোম্পানির জন্য এআই প্রযুক্তি তৈরি করবে স্পেসএক্স। তাদের সম্ভাব্য আয়ের সিংহভাগই এ খাত থেকে আসবে বলে আশা কোম্পানিটির।
রয়টার্সের দেখা স্পেসএক্সের ‘এস-১’ নথি অনুসারে, স্পেসএক্সের ধারণা, কোম্পানিটির সম্ভাব্য ‘টোটাল অ্যাড্রেসেবল মার্কেট’ বা টিএএম বাজারের সম্ভাব্য আকার হতে পারে প্রায় ২৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
‘টোটাল অ্যাড্রেসেবল মার্কেট’ বা টিএএম হচ্ছে এমন এক পরিমাপ, যা দিয়ে বোঝানো হয় একটি কোম্পানি যদি কোনো নির্দিষ্ট বাজারের সব গ্রাহককে ধরতে পারে তবে তারা সর্বোচ্চ কত অর্থ আয় করতে পারবে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকির কথা ‘এস-১’ নথির মাধ্যমে প্রকাশ করে।
স্পেসএক্সের এ নথি থেকে জানা গেছে, কোম্পানিটি আশা করছে তাদের মোট বাজারের ৯০ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ২৬.৫ ট্রিলিয়ন ডলার আসবে এআই খাত থেকে। আর এ আয়ের বড় অংশ প্রায় ২২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার আসতে পারে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কোম্পানির জন্য তৈরি বিশেষায়িত এআই পরিষেবা থেকে।
আগামী গ্রীষ্মেই স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে নামার পরিকল্পনা করছে। তাদের লক্ষ্য প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য তৈরি এবং এর মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করা।
কোম্পানিটি সফল হলে তা হবে ইতিহাসের বৃহত্তম আইপিও।
নথিতে স্পেসএক্স বলেছে, “আমরা বিশ্বাস করি, আমরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও কার্যকর বাজার চিহ্নিত করতে পেরেছি।”
স্পেসএক্স তাদের ভবিষ্যৎ আয়ের যে বড় সুযোগের কথা বলছে তা তাদের বর্তমান আয়ের উৎসের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি স্পেসএক্স।
কোনো কোম্পানির ‘টিএএম’ সরাসরি ভবিষ্যৎ আয়ের পূর্বাভাস বা মূল্যায়ন না হলেও উচ্চ প্রবৃদ্ধিওয়ালা কোম্পানির সম্ভাবনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য তা বড় এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
এসব অঙ্ক সাধারণত বড় হয়ে থাকে এবং খুব কম ক্ষেত্রেই এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। যেমন, ২০১৯ সালে উবার শেয়ারবাজারে আসার সময় দাবি করেছিল, কেবল রাইড-শেয়ারিং ব্যবসায় তাদের ৫.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্পেসএক্সের তিনশো পৃষ্ঠারও বেশি আর্থিক নথিতে লুকিয়ে থাকা এ চমকপ্রদ তথ্যটি এআই প্রযুক্তির অগ্রগতিতে মাস্কের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের দীর্ঘদিনের ইচ্ছাকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
বর্তমানে ব্যবসার জন্য ‘এআই ফর এন্টারপ্রাইজ’ বাজারটি অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের দখলে। এ দুই শীর্ষ কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে এবং তারাও এ বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে এআই স্টার্টআপ এক্সএআইকে কিনেছে স্পেসএক্স, যা ২০২৩ সালের শুরুতে মাস্ক নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
স্পেসএক্সের নথিতে দেখা গেছে, এক্সএআই এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের কোম্পানি ও বর্তমানে তা বেশ বড় অঙ্কের লোকসানে চলছে।
২০২৫ সালে এআই স্টার্টআপটি প্রায় ৬৪০ কোটি ডলার লোকসান করেছে, যা আগের বছরের ১৬০ কোটি ডলার লোকসানের তুলনায় বেশি। এ মোটা অঙ্কের লোকসান স্টারলিংকের লাভকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে স্পেসএক্সের আয়ের প্রধান উৎস স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট ব্যবসা ‘স্টারলিংক’। গত বছর স্পেসএক্সের মোট ১ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার আয়ের মধ্যে ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলারই এসেছে স্টারলিংক থেকে এবং এর মাধ্যমে চারশো ৪০ কোটি ডলার পরিচালনা মুনাফা হয়েছে।
তবে এআই স্টার্টআপটির বড় লোকসানের কারণে সার্বিকভাবে স্পেসএক্স গত বছর ৪৯০ কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়েছে। স্পেসএক্সের এ এআই ইউনিটের পেছনে খরচও অনেক।
২০২৫ সালে স্পেসএক্সের মোট মূলধনী ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০ কোটি ডলারে। যার মধ্যে কেবল এআই খাতেই খরচ হয়েছে ১ হাজার ২৭০ কোটি ডলার, যা তাদের মহাকাশ ও ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবসার সম্মিলিত খরচের চেয়েও বেশি।
কোম্পানিটি বলেছে, এক্সএআইয়ের আগে থেকে কিছু টুল বা মাধ্যম ব্যবহার করে লাভবান হতে পারে তারা। যার মধ্যে রয়েছে গ্রক ও টেসলার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ‘ম্যাক্রোহাড’ নামের স্বয়ংক্রিয় বা এজেন্টিক প্ল্যাটফর্ম।
নথিতে কোম্পানিটি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে বলেছে, এআই ও অন্যান্য প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য তাদের বড় খরচের পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে এআই পরিচালনার মূল শক্তি বা চাবিকাঠি হিসেবে পরিচিত জিপিইউ বা গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট তৈরির বিষয়টিরও উল্লেখ রয়েছে।
স্পেসএক্স বলেছে, তারা এক বিশেষায়িত বিক্রয় দল গঠন করবে। ‘ফরোয়ার্ড ডেপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’ নামে পরিচিত এসব কর্মী সরাসরি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থাকবে, যাতে সেখানকার কর্মীরা সহজেই এআই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে ও কাজে লাগাতে পারে।
“আমাদের ব্যবসায়িক কৌশল মূলত বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পগুলোর ডিজিটাল চাহিদা মেটাতে এআই সমাধান দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেবে। আমরা বিশ্বাস করি, এ বিশেষ কৌশলটিই আমাদের দ্রুত বেড়ে ওঠা এআই সুযোগটি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে রাখবে।”
তবে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার সঙ্গে পরিচিত একজন সূত্র অবশ্য বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি।
তিনি বলেছেন, “আপনি যদি বাস্তববাদী হয়ে কেবল বর্তমানে দৃশ্যমান ব্যবসাগুলোর ওপর ভিত্তি করে কোম্পানির মূল্যায়ন করতে চান তাহলে বাজার এ কোম্পানির যে দাম নির্ধারণ করতে যাচ্ছে আপনি তার ধারেকাছেও থাকতে পারবেন না।”