Published : 15 May 2026, 11:29 AM
গান গাওয়া, ছবি আঁকা বা গ্যালারি ও জাদুঘর পরিদর্শনের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের বার্ধক্যের গতি ধীর করে দেয়– এমনই উঠে এসেছে শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক নিয়ে করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
এ গবেষণায় প্রথমবারের মতো প্রমাণ মিলেছে, নিজে কোনো শিল্পবিষয়ক কাজে অংশ নেওয়া বা কোনো প্রদর্শনী দেখতে যাওয়ার মতো কাজগুলো মানুষকে জৈবিকভাবে দীর্ঘসময় তরুণ রাখতে সাহায্য করে।
‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর প্রধান গবেষক অধ্যাপক ডেইজি ফ্যানকোর্ট বলেছেন, “গবেষণার এসব ফলাফল আমাদের দেহের ওপর শিল্পের ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি প্রমাণ করেছে।
“শরীরচর্চা বা ব্যায়াম যেমন শরীরকে সুস্থ রাখে ঠিক একইভাবে শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ থাকাও যে সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ গবেষণায় তারই প্রমাণ মিলল।”
তবে বার্ধক্যের গতি ধীর হওয়ার মানেই যে ওই ব্যক্তি দীর্ঘজীবী হবেন, তা নিশ্চিত নয়। গবেষণায় জৈবিক বার্ধক্য পরিমাপের জন্য যে ‘এপিজেনেটিক ক্লক’ ব্যবহার করা হয়েছে তা কেবল ভবিষ্যতে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বা মৃত্যুর পূর্বাভাসের সংকেত দেয়।
আগের কিছু গবেষণায় শিল্পচর্চার সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্কের কথা বলা হলেও বিষয়টি সরাসরি আয়ু বাড়ায় কি না তা নিশ্চিত করতে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন।
যারা নিয়মিত শিল্পচর্চা করেন তাদের জৈবিক বার্ধক্যের গতি তত ধীর। গবেষণার একটি পদ্ধতি অনুসারে, সপ্তাহে যারা অন্তত একবার শিল্পকর্মে অংশ নিয়েছেন তাদের বার্ধক্যের প্রক্রিয়া ৪ শতাংশ ধীর হয়ে যায় এবং যারা মাসে অন্তত একবার অংশ নেন তাদের ক্ষেত্রে এই হার ৩ শতাংশ।
গবেষণার অন্য এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা এই চর্চা করেন না তাদের তুলনায় যারা সপ্তাহে অন্তত একবার কোনো শিল্পচর্চায় সময় দিয়েছেন তারা জৈবিকভাবে গড়ে এক বছর বেশি তরুণ।
একই মাপে দেখা গিয়েছে, যারা সপ্তাহে একবার ব্যায়াম করেন তারা অন্যদের তুলনায় কেবল ছয় মাস বেশি তরুণ, অর্থাৎ এ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যায়ামের চেয়েও শিল্পচর্চার প্রভাব বেশি দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, বার্ধক্যের গতি ধীর করার ক্ষেত্রে শিল্পচর্চার প্রভাব এতটাই জোরালো যে বিষয়টিকে একজন ধূমপায়ী ও ধূমপান ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তির মধ্যে থাকা পার্থক্যের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ও ইউসিএল-এর অধ্যাপক ড. ফিফেই বু বলেছেন, “আমাদের গবেষণায় প্রথম প্রমাণ মিলল, শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চা জৈবিক বার্ধক্যের গতিকে ধীর করে দেয়, যা স্বাস্থ্যের ওপর শিল্পের প্রভাব সংক্রান্ত আগের বিভিন্ন প্রমাণকে আরও জোরালো করে। ব্যায়াম যেমন মানসিক চাপ, প্রদাহ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেও ঠিক একই সুফল মেলে।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ইনোভেশন ইন এজিং’-এ, যা ৩ হাজার ৫৫৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির রক্ত পরীক্ষা ও জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
গবেষকরা মানুষের রক্তের নমুনা ব্যবহার করে তাদের জৈবিক বয়স ও বার্ধক্যের গতি নির্ণয় করেছেন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, গত এক বছরে তারা কতবার গান গাওয়া, নাচ, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি বা হস্তশিল্পের মতো কাজে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি কতবার তারা কোনো শিল্প প্রদর্শনী, জাদুঘর, লাইব্রেরি বা ঐতিহাসিক কোনো স্থান ও পার্কে ঘুরতে গিয়েছেন সেই তথ্যও নেওয়া হয়।
‘আর্টস কাউন্সিল ইংল্যান্ড’-এর পরিচালক হলি স্মিথ-চার্লস বলেছেন, “আমরা অনেকেই সহজাতভাবে জানি, সুখী ও প্রাণবন্ত জীবনের জন্য সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ।
“এ গবেষণার ফলাফলে নতুন করে প্রমাণ করল, শিল্পকলা, জাদুঘর ও লাইব্রেরি আমাদের দীর্ঘকাল সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি, যেন সব জায়গার মানুষ তাদের হাতের নাগালে উন্নত ও সাশ্রয়ী সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধা পান।”
বর্তমানে এমন অনেক প্রমাণ মিলেছে, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, শিল্পকলা মানুষের মানসিক ও শারীরিক উভয় ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে অস্ত্রোপচারের আগে রোগীদের গান শোনানো ও স্মৃতিভ্রংশ আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় শিল্পকলা ব্যবহারের মতো বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল তুলে ধরা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মধ্যবয়স্ক ও বয়স্ক ব্যক্তিরা শিল্পকলায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাদের বার্ধক্যের গতি ধীর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন।
লন্ডনের ‘সাউথব্যাঙ্ক সেন্টার’-এর শিল্পবিষয়ক পরিচালক মার্ক বল বলেছেন, “শিল্প ও সংস্কৃতি খাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আমরা দীর্ঘকাল ধরেই জানি, সৃজনশীল কাজ স্বাস্থ্যের জন্য অসাধারণ সুফল বয়ে আনে। গবেষণাটি সেই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উন্মোচন ও প্রমাণ করল যে, শিল্প ও সংস্কৃতি আমাদের জৈবিক ঘড়িকেও ধীর করে দিতে পারে।”
সাউথব্যাঙ্ক কমপ্লেক্সটি ১৯৫১ সালে ‘ফেস্টিভ্যাল অফ ব্রিটেন’-এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সময় একে ‘জাতির জন্য একটি টনিক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যা কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না বলেই উল্লেখ করলেন বল।
“বিষয়টি ছিল সুস্পষ্ট স্বীকৃতি, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও বিষাদ কাটিয়ে ওঠার জন্য মানুষের আশাবাদ ও মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন, যা এই শিল্পচর্চার মাধ্যমেই সম্ভব। সেই চেতনা আজও অম্লান ও বর্তমান সময়ে এর প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়েও বেশি।”