Published : 15 Jun 2026, 10:18 AM
গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা কারণ থাকলেও এর পেছনে এবার আধুনিক জীবনের অন্যতম সঙ্গী আইফোনের পরোক্ষ প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।
২০০৭ সালে বাজারে আইফোনের আগমন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্মহারের প্রবণতায় বড় পরিবর্তনের সঙ্গে মিলে যায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে গ্লোবাল নিউজ।
সময়ের এ নিখুঁত মিলটিই ভার্মন্টের ‘মিডলবারি কলেজ’-এর মার্কিন অর্থনীতিবিদ ক্যাটলিন মেয়ার্সকে উদ্বুদ্ধ করেছে আইফোন ও জন্মহার কমে যাওয়ার বিষয়ের মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে।
মেয়ার্স বলেছেন, “জন্মহার কেন এভাবে হু হু করে কমছে? এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৭ সালের পর থেকে জন্মহার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ কমেছে।”
তার এ গবেষণায় খতিয়ে দেখা হয়েছে, স্ক্রিন টাইম বা ফোনের পর্দায় কাটানো সময় বেড়ে যাওয়া ও ডিজিটাল যোগাযোগের প্রতি মানুষের অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়া কি বাস্তব জীবনের পারস্পরিক বা সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে কি না, যা পরোক্ষভাবে গর্ভধারণের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ধারণা নিয়ে পরীক্ষার জন্য আইফোন বাজারে আসার শুরুর বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কাউন্টি বা অঞ্চলের জন্মহার বিশ্লেষণ করেছেন মেয়ার্স।
ওই সময় ডিভাইসটি কেবল ‘এটিঅ্যান্ডটি’ মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাওয়া যেত। যার মানে, কিছু অঞ্চলে আইফোন ব্যবহারের সুবিধা ছিল, আবার কিছু অঞ্চলে ছিল না।
আয়, শিক্ষা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতির মতো অন্যান্য প্রভাবককে নিয়ন্ত্রণে রেখে যখন তিনি এসব অঞ্চলের মধ্যে তুলনা করেছেন তখন দেখা গেছে, যেসব এলাকায় আইফোনের সহজলভ্যতা ছিল সেখানে জন্মহার দ্রুত গতিতে কমেছে।
“আমরা লক্ষ্য করেছি, যেসব জায়গায় আইফোন পাওয়া যাচ্ছিল, সেখানে জন্মহার তুলনামূলকভাবে দ্রুত কমেছে।”
এ তত্ত্বটি বেশ সহজ। মানুষ অনলাইনে যত বেশি সময় কাটাচ্ছে বাস্তব জীবনে একে অপরের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ ততটাই কমে যাচ্ছে।
মেয়ার্স বলেছেন, “আপনি যখন কারো সঙ্গে বাস্তবে বা সরাসরি সময় কাটাচ্ছেন না তখন গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।”
বর্তমানে বহু দেশে জন্মহার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার ন্যূনতম হারের চেয়েও নিচে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার বর্তমানে প্রতি নারীর বিপরীতে প্রায় ১.৬ জন সন্তান।
অন্যদিকে কানাডায় এ চিত্র আরও উদ্বেগজনক, সেখানে এ হার কেবল ১.২৫ এর কাছাকাছি। এ প্রবণতা কেবল ধনী বা উন্নত দেশগুলোর মধ্যেই সীমিত নেই। বিশ্বজুড়েই বর্তমানে জন্মহারের এ নিম্নমুখী গ্রাফ রেকর্ড করা হচ্ছে।
এত কিছুর পরও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, স্মার্টফোন এ পরিস্থিতির একমাত্র বা প্রধান কারণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
২০০০-এর দশকে বেশ কিছু বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল, যা বর্তমানের এ ‘বেবি বাস্ট’ বা জন্মহারের আকস্মিক পতনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বজুড়ে আর্থিক সংকট, আবাসন খরচ বেড়ে যাওয়া, শিক্ষার উচ্চ হার ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা।
স্বেচ্ছায় সন্তানহীন থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করেন লেখক সেলিয়া চ্যান্ডলার। তার ধারণা, প্রযুক্তি ও সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক টানাটা কিছুটা বাড়াবাড়ি হতে পারে।
“প্রযুক্তি মানুষকে সন্তান নেওয়া থেকে দূরে রাখছে এমন দাবি আমার কাছে কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হয়।”
তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পরিবর্তনের একটি হচ্ছে এখনকার মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, মা বা বাবারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি ক্ষমতায়িত বোধ করেন।
“আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি যে আমি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছি যখন আমার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল।”
গবেষকরা বলছেন, কেবল আইফোন দিয়ে এত জটিল বৈশ্বিক প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। মানুষ যেভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সম্পর্ক তৈরি করে ও জীবনের কাঠামো সাজায় আইফোন হয়ত সেই সার্বিক পরিবর্তনেরই একটি অংশ মাত্র।